হাতশেপসুত, Stay Curioussis
হাতশেপসুত, Stay Curioussis

Reconstruction face of the Queen Hatshepsut. Wife of King Thumosis II.

হাতশেপসুত, Stay Curioussis

৩০০০ বছরের পুরোনো মিশরের সভ্ভতায় বহু ইতিহাস আছে যা আজও পৃথিবীর মানুষের কাছে অজানা। তার মধ্যে একটি হলো নারী ফারাও। হ্যা, এই মিশরকে একদিন নারী ফারাওরা শাসন করেছেন। যদিও পুরুষদের তুলনায় সেই সংখ্যা ছিল খুবই কম। অনেক নারী ফারাওদের নাম ইতিহাস থেকে মুছেও ফেলা হয়েছে। মিশর সভ্ভতাকে শাসন করা এমনই একজন নারী ফারাও ছিলেন হাতশেপসুত।

হাতশেপসুত, Stay Curioussis

Jar bearing the cartouche of Hatshepsut. Filled in with cedar resin. Calcite, unfinished. Foundation deposit. 18th Dynasty. From Deir el-Bahari, Egypt. The Petrie Museum of Egyptian Archaeology, London.

হাতশেপসুত ছিলেন রাজা প্রথম থুতমোস এবং তার প্রধান স্ত্রী রানী আহমোসের মেয়ে। সম্ভবত ১৫০৭ খ্রিস্টপূর্বে হাতশেপসুতের জন্ম। রাজার সন্তান হওয়ায় নিয়মানুসারে পরবর্তী রাজা হিসেবে তারই সিংহাসনে বসার কথা। কিন্তু সে ছিল একজন মেয়ে। আর মেয়েদের শাসন মিশরীয়রা কখনোই মেনে নেয়নি। তাই প্রথম থুতমোসের মৃত্যুর পর রাজা হন তার আরেক সন্তান, হাতশেপসুতের সৎ ভাই- দ্বিতীয় থুতমোস। সিংহাসনে বসার পর দ্বিতীয় থুতমোসের সাথে হাতশেপসুতের বিয়ে হয়। শুনতে অন্যরকম লাগলেও ভাই-বোনের বিয়ে তখনকার মিশরীয় সমাজে খুবই স্বাভাবিক একটা নিয়ম ছিল। এই কাজটা তারা এই কারণে করতো যাতে রাজবংশের রক্তের সাথে অন্য কোনো রক্ত মিশে না যায়।

হাতশেপসুত, Stay Curioussis

দ্বিতীয় থুতমোস ফারাও হলেও ঐতিহাসিকদের অনেকের ধারণা রাজ্য শাসনের ভার ছিল হাতশেপসুতের হাতেই। কিন্তু দ্বিতীয় থুতমোসের মৃত্যুর পর আবারো সেই একই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হলো, কে হবে পরবর্তী ফারাও? সেই চিন্তা থেকেই সবার আগে আসে হাতশেপসুতের নাম। তিনি যেমন ছিলেন একজন যোগ্য রাজার মেয়ে, অন্যদিকে তিনি ছিলেন একজন রানী। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিয়ে পরবর্তী রাজা ঘোষণা করা হয় দ্বিতীয় থুতমোসের ছেলে তৃতীয় থুতমোসকে। কিন্তু সেই সময় তার বয়স ছিল মাত্র তিন বছর। এই বয়সে রাজ্য পরিচালনা করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মিশরের সিংহাসনে বসেন হাতশেপসুত।

হাতশেপসুত, Stay Curioussis

Head of Hatshepsut wearing the royal headdress. 18th Dynasty, c. 1460 BC. State Museum of Egyptian Art, Munich

সিংহাসনে বসার পর তার উদ্দেশ্য ছিল নিজেকে একজন যোগ্য ফারাও প্রমান করা। মিসরীয় ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী ফারাও প্রথম থুতমোস ছিলেন মহাদেবতা আমুনের বংশধর। সেই হিসেবে হাতশেপসুতও সেই দেবতারই বংশধর। আর এটাই ছিল তার ফারাও হবার পথে নতুন সম্ভাবনা।

হাতশেপসুত, Stay Curioussis

Hatshepsut as King, Offering Food to the God Horus Image from the Temple of Hatshepsut, Luxor, Egypt. Ann Ronan Pictures Print Collector Getty Images

হাতশেপসুত দেখতে খুব সুন্দরী ও বুদ্ধিমতী ছিলেন। কিন্তু তারপরও তাকে ফারাও হিসেবে মেনে নিতে পারছিলেন না অনেকেই। রাজ্যের মানুষের কাছে সম্মান পেতে তাকে বেছে নিতে হয়েছিল নানা পথ। তাই তিনি তার নারী রূপকে পুরুষের বেশে ঢেকে ফেলেন। পুরুষের মতো পোশাক ও নকল দাড়ি পড়া শুরু করলেন। ধীরে ধীরে তার এই প্রয়াস সকলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়।

হাতশেপসুত, Stay Curioussis

The Hawk of the Pharaoh, Hatshepsut—Temple at Luxor

হাতশেপসুত তার নিজ যোগ্যতায় প্রায় বাইশ বছর মিশরের একজন সফল শাসক হিসেবে রাজ্য শাসন করেছিলেন। তার রাজত্বকালে রাজকীয় স্থাপনা থেকে শুরু করে সমাধি, মন্দির, ওবেলিস্ক (সুউচ্চ মূর্তি), অসংখ্য ভাস্কর্য নির্মাণ করেছিলেন। তার স্থাপনাগুলোর মধ্যে বিখ্যাত হলো কর্নাক মন্দির। নীলনদের তীরে অবস্থিত এই মন্দিরে রয়েছে অনেকগুলো উঁচু উঁচু ওবেলিস্ক। মিশরের সবচেয়ে বড়ো ওবেলিস্কগুলোর মধ্যে অন্যতম। এখনো সেই ওবেলিস্কগুলো টিকে আছে স্বগর্বে। ওবেলিস্কগুলোর গায়ে লাল গ্রানাইটের পাথর দিয়ে খোদাই করা বিভিন্ন ছবি ও চিহ্ন আছে, যা সেই সময়ের সম্পদ বলে দাবি করে।

হাতশেপসুত, Stay Curioussis

Thutmose I, as portrayed in Hatshepsut’s temple at Deir el- Bahri. Image via Paul James Cowie Wikimedia Commons.

হাতশেপসুত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও তার সফলতা দেখিয়েছিলেন। পান্ট যাত্রার মধ্যে দিয়ে ২০০ বছরে ভেঙে যাওয়া সম্পর্ককে জোড়া লাগান হাতশেপসুত। পান্ট হলো বর্তমান লোহিত সাগরের কাছাকাছি একটি জায়গা। মিশর পান্ট থেকে লোবান, গন্ধরস ও সোনাসহ আরও দুর্লভ জিনিসপত্র বাণিজ্য শুরু করে। পান্ট থেকে ৩১ টি গন্ধরসের গাছ মিশরে এনে লাগানো হয়েছিল যা সেইসময়ের মিসরে রোপন করা প্রথম বিদেশী গাছ। লোবান থেকে তৈরী করা হয় চোখের কাজল। পান্টের সাথে মিশরের এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক হাতশেপসুতের মৃত্যুর আগে পর্যন্ত বজায় ছিল।

হাতশেপসুত, Stay Curioussis

Colonnaded design of Hatshepsut temple

হাতশেপসুতের আরেকটি বিখ্যাত স্থাপনা হলো মা’আত মন্দির। যার দেয়ালে হাতশেপসুত আর তার সৎ ছেলে তৃতীয় থুতমোসের মূর্তি খুব চমৎকারভাবে খোদাই করা আছে। মন্দিরের ভিতরে যে বড়ো হলঘর রয়েছে সেখানে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো।

হাতশেপসুত, Stay Curioussis

হাতশেপসুতকে মৃত্যুর পর তারই তৈরী মন্দির আল – বাহরিতে সমাহিত করা হয়। মন্দিরটি নির্মাণশৈলী এটি সুন্দর যে হাজার হাজার বছর পরের গ্রিক সভ্ভতাকেও হার মানায়। মন্দিরের দেয়ালে এই নারীর জন্মের পৌরণিক কাহিনী ও সাফল্যগাঁধা খোদাই করে লেখা আছে, যেখানে তাকে মহাদেবতা আমুনের মেয়ে বলে সম্বোধন করা হয়েছে।

হাতশেপসুত, Stay Curioussis

Osirian statues of Hatshepsut at her tomb, one stood at each pillar of the extensive structure, note the mummification shroud enclosing the lower body and legs as well as the crook and flail associated with Osiris—Deir el-Bahri

হাতশেপসুতের মৃত্যুর পর তৃতীয় থুতমোস সিংহাসনে বসেন। অনেক ঐতিহাসিকদের মতে, তৃতীয় থুতমোস হাতশেপসুতের স্থাপনাগুলো থেকে তার নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করেন। এমনকি তিনি ও তার ছেলে হাতশেপসুতের কীর্তিগুলোকে নিজের বলেও চালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু মিশরের ইতিহাসে হাতশেপসুতের অবদান এতো বেশি যে চাইলেও তা সম্ভব হয়ে উঠেনি।  তার সমস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে হাতশেপসুত কিছু না কিছু প্রমান রেখেই গেছেন। উনিশ শতকে বিখ্যাত ইজিপ্টোলজি এবং হায়ারোগ্লিফিক কোডার জন ফ্রান্সিস শ্যাম্পলিয়ন হাতশেপসুতের নাম আবার সকলের সামনে তুলে ধরেন। বর্তমান মিশরে তার তৈরী এই সকল স্থাপনাগুলো পর্যটকদের কাছে পিরামিডের পরেই প্রধান আকর্ষণীয় স্থান।

হাতশেপসুত, Stay Curioussis

Copper or bronze sheet bearing the name of Hatshepsut. From a foundation deposit in “a small pit covered with a mat” found at Deir el-Bahri, Egypt. 18th Dynasty. The Petrie Museum of Egyptian Archaeology, London

হাতশেপসুত, Stay Curioussis

 

হাতশেপসুত, Stay Curioussis
হাতশেপসুত, Stay Curioussis
হাতশেপসুত, Stay Curioussis

উর্বশি-পুরুরবাঃ স্বর্গের অপ্সরী ও মর্ত্যের মানুষের ভালোবাসার গল্প

ভারতীয় পুরাণের এক অমূল্য নিদর্শন হচ্ছে মহাভারত। প্রাচীন ও সুবিশাল এই মহাকাব্যটিকে গন্য করা হয় পৃথিবীর প্রাচীন চার বিখ্যাত মহাকাব্যের একটি হিসেবে। এই বিশাল  কাহিনি-কাব্যের পাতায় পাতায় আছে রাজনীতি, কূটনীতি, দর্শন, যুদ্ধ,ভালোবাসা, রাজাদের বীরত্বগাঁথা ইত্যাদি। বলা হয় যা...

নীল পূজার লোককাহিনী: নীলের ঘরে দিলাম বাতি

'নীলের ঘরে দিলাম বাতি      সাক্ষী থেকো মা ভগবতী।' বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। বছরজুড়ে উৎসবের শেষ নেই। আর গ্রামবাংলার লৌকিক উৎসব আর পার্বণ তো অগণ্য। বাঙালি হিন্দুদের তেমনি এক পার্বণ হলো নীলের পূজা। কালের চক্রে শহুরে হিন্দুসমাজে তেমন একটা প্রচলন আজকাল না থাকলেও...

কর্ণ, ভীষ্ম সংবাদ

রাত্রি দ্বিপ্রহর। চারিদিক নিস্তব্ধ, ভয়ংকর নিরবতায় আচ্ছন্ন। দূরথেকে কয়েকটা কুকুরের ডাক ভেসে আসছে। কুরুক্ষেত্রের বিশাল প্রান্তর এখন যেনো এক বিরান মরুভূমিতে পরিনত হয়েছে। হঠাৎ কৌরব শিবিরের একটি তাঁবু থেকে দীর্ঘকায়, সুঠামদেহী একটি ছায়ামূর্তি বের হয়ে এলো। পাহারারত প্রহরীরা...

ভয়ংকর শরভ অবতার

ভারতীয় পুরাণে উল্লিখিত দেবতা বিষ্ণুর দশ অবতারের কথা সর্বজনবিদিত। ধরায় যখন পাপাচার অনেক বেড়ে যায় তখন শিষ্ঠের পালন ও দুষ্টের দমনে  বিষ্ণু অবতার রূপ ধারন করেন।  কিন্তু পুরাণের আরেক প্রভাবশালী দেবতা মহাদেব শিবেরও বেশ কিছু অবতারের ব্যাপারে জানা যায়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য...

সত্যবতী ও বেদব্যাস

কৃষ্ণদৈপায়ন ব্যাসের রচিত মহাভারত এক অত্যাশ্চর্য এবং প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের সর্ব বৃহৎ গ্রন্থ। শাস্ত্র বিশেষজ্ঞ বলে থাকেন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের কালসীমা খ্রী. পূ. ৩০০০ অব্দের আশপাশে (যদিও মতান্তর আছে)। তার কিছুকাল পর মহাভারত রচিত হয়। মহাভারত গল্প যেকোনো আধুনিক গল্পের...

মেহেদী হাসান খান

মেহেদী হাসান খান ১৮ বছর বয়সের মেহেদী হাসান খান ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়তে ভর্তি হলেন,কিন্তু পড়াশোনায় তার মন নাই! কিন্তু কেন? তিনি নাওয়া- খাওয়া, পড়াশোনা বাদ দিয়ে একটা ছোট্ট কম্পিউটার সম্বল করে বাংলা ভাষায় লেখার জন্য লড়াই শুরু করলেন। একটাই জেদ, বাংলা...

ঢাকার হারিয়ে যাওয়া সংগ্রহশালা- বলধা জাদুঘর

১৯২৫ সালের ঢাকা; ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশন থেকে বেরিয়ে রেললাইন ধরে নারায়ণগঞ্জের দিকে কিছুদূর এগুলে উয়ারি। উয়ারির শেষ সীমানায় এক সরু রাস্তা চলে দিয়েছে নারিন্দার দিকে। সরু সেই রাস্তার একপাশে বহু পুরাতন খ্রিস্টান কবরখানা আর তার বিপরীতে উঁচু পাচিলঘেরা কম্পাউন্ডের ভেতর দোতলা...

সুন্দরবন ধ্বংসের ইতিবৃত্ত

ব্রাজিলের চিরসবুজ বিস্তৃত এমাজন (Amazon Rainforest) গহীন বনাঞ্চলকে বলা হয় বিশ্বের ফুসফুস, তেমনি সুন্দরবনও বাংলাদেশের শ্বাস-প্রশ্বাসের এক অঙ্গ। এই ঘন বনাঞ্চল বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগেরও এক প্রতিরোধ। সুন্দরবনকে ঘিরে আশেপাশের জনপদে ছড়িয়ে আছে অনেক পৌরাণিক কাহিনী। এমনি...

ঢাকার এক বিস্মৃত চিকিৎসক

দিনটি ছিল ১৫ই নভেম্বর ১৮৬৪ সাল, মঙ্গলবার। সন্ধ্যা নামতে আর বেশি দেরি নেই। নারিন্দার খ্রিস্টান কবরস্থানের দীর্ঘ ঘাসের ঝোপে অবশ্য তখনই অন্ধকার নেমে এসেছে। সন্ধ্যা হলে এই এলাকায় সহজে কেউ পা বাড়ায় না। কিন্তু সেদিন পুরো এলাকা লোকে লোকারণ্য- আছে ইংরেজ, আরমেনিয়, দেশী সব...

ঢাকার ঐতিহাসিক তারা মসজিদ

পূর্বকথাঃ উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের কথা। আরমানিটোলার মহল্লা আলে আবু সাঈদে তখন এক প্রভাবশালী জমিদারের বাস, নাম- মীর্জা গোলাম পীর। দাদা মীর আবু সাঈদ  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রমরমা যুগে তুরস্ক থেকে এসে ঢাকায় থিতু হয়েছিলেন। মীর্জা গোলাম পীরের আরেক নাম মীর্জা আহমেদ জান। তবে...