গবেষকদের একটি বড় অংশের মতে, খ্রিস্টের জন্মের বহু আগেই, প্রায় এক থেকে দুই হাজার বছর আগে ভাং ভারতীয় উপমহাদেশে পরিচিত হয়ে ওঠে। ধারণা করা হয়, আর্যদের আগমনের সাথেই এই অঞ্চলে ভাং-এর প্রচলন শুরু হয়েছিল। যদিও ভাং-এর প্রকৃত উৎপত্তিস্থল নিয়ে নানা মতভেদ রয়েছে, তবে মধ্য এশিয়ার বিস্তৃত এলাকাজুড়ে গাঁজার স্বাভাবিক উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়। মঙ্গোলিয়া, মধ্য সাইবেরিয়া, হুয়াং হে নদীর উপত্যকা, হিন্দুকুশ পর্বতমালা, আফগানিস্তান থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়া, এই পুরো অঞ্চলে একসময় গাঁজা জন্মাত বলে গবেষকরা মনে করেন।
ভারতীয় উপমহাদেশে গাঁজা ও ভাং সংক্রান্ত সবচেয়ে প্রাচীন লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায় অথর্ববেদে, যা রচিত হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব প্রায় দেড় হাজার বছর আগে। সেখানে ভাং-এর কথা বলা হয়েছে মানসিক দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতা প্রশমনের সহায়ক হিসেবে। এই তথ্য থেকেই বোঝা যায়, ভাং প্রাচীন ভারতে কেবল ভোগের বস্তু ছিল না, বরং চিকিৎসা ও আধ্যাত্মিক চর্চার সাথেও যুক্ত ছিল।

ভারতের ভাং পানকারী (১৭৯০) © wikipedia
ভাং মূলত গাঁজা উদ্ভিদ থেকে তৈরি হয়। গাঁজা ক্যানাবাসিয়া পরিবারভুক্ত একটি ফুলজাতীয় উদ্ভিদ, যার প্রজাতি সংখ্যা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো বিতর্ক রয়েছে। ভারতীয় সমাজে বহু শতাব্দী ধরেই ধর্মীয় আচার ও লোকচিকিৎসায় গাঁজার ব্যবহার দেখা যায়। হিন্দু ধর্মে শিবসহ বিভিন্ন দেবতার পূজায় গাঁজা বা ভাং নিবেদন করা হতো এবং পরে তা প্রসাদ হিসেবে ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হতো। এই দীর্ঘ ধর্মীয় চর্চার কারণেই ভাং অনেক অঞ্চলে সামাজিকভাবে পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। ভাং বা খৈনির মতো কিছু মাদকদ্রব্য তাই এখানে অনেক সময় স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবেই বিবেচিত হয়েছে।
বৈদিক সাহিত্যে আরেকটি রহস্যময় পানীয়ের উল্লেখ রয়েছে, যার নাম সোমরস। ঋগবেদে প্রায় শতাধিকবার সোমরসের কথা বলা হয়েছে, যা দেবরাজ ইন্দ্রের পূজায় ব্যবহৃত হতো। তবে সোমলতা নামের যে উদ্ভিদ থেকে এই পানীয় তৈরি হতো বলে ধারণা করা হয়, তার প্রকৃত পরিচয় আজও অজানা। খাদ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক ইতিহাসবিদরা সোমলতাকে ভারতীয় খাদ্য ইতিহাসের সবচেয়ে অমীমাংসিত রহস্যগুলোর একটি বলে মনে করেন। সোমলতার কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ না পাওয়া গেলেও, অনেকেই মনে করেন আজকের জনপ্রিয় ভাং-ই হয়তো সেই হারিয়ে যাওয়া সোমরসের একটি আধুনিক রূপ বা উত্তরসূরি।

ভারতের ভাং পানকারী © wikipedia
ভাং-এর ব্যবহার শুধু উত্তর ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ভারতের পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে ওড়িশায়, ফল দিয়ে তৈরি মিষ্টি শরবতের সঙ্গে ভাং মেশানোর প্রথার কথা জানা যায়। এই শরবত স্থানীয়ভাবে ‘পানা’ নামে পরিচিত। যেমন বাংলায় শিবচতুর্দশীতে বেলপানা শিবপূজার গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তেমনি ওড়িশায় নববর্ষ উপলক্ষে ‘পানা সংক্রান্তি’ উৎসবে বিভিন্ন ফলের পানা তৈরি করা হয়, যেখানে একসময় ভাং ব্যবহারের চল ছিল। অতীতে এই পানীয় হাতেই তৈরি করা হতো, যদিও আধুনিক সময়ে যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে।
তরল পানীয় ছাড়াও অতীতে ভাং অন্য রূপেও ব্যবহৃত হয়েছে। ঔপনিবেশিক আমলের লেখালেখিতে দুধ, ঘি ও চিনি দিয়ে তৈরি বিশেষ খাদ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়, যেখানে গাঁজার সংমিশ্রণ থাকত। এই ধরনের খাবার ছোট ছোট অংশে কেটে পরিবেশন করা হতো। সময়ের সাথে সাথে ভারতীয় মিষ্টান্ন যত বৈচিত্র্যময় হয়েছে, ততই ভাং যুক্ত খাবারের সংখ্যাও বেড়েছে। বর্তমানে কিছু কিছু অঞ্চলে ভাং মেশানো লাড্ডু, পেড়া বা নতুন ধরনের মিষ্টি পাওয়া যায় বলে জানা যায়।
তবে ইতিহাস বলছে, ভাং সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে সমানভাবে প্রচলিত ছিল না। একসময় শ্রমজীবী মানুষ, ভিক্ষুক কিংবা গৃহস্থালির কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের মধ্যেই ভাং-এর ব্যবহার বেশি দেখা যেত। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষ সাধারণত নির্দিষ্ট কিছু ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময় অল্প পরিমাণে ভাং গ্রহণ করতেন। দৈনন্দিন জীবনে এর ব্যবহার তাদের মধ্যে খুব একটা প্রচলিত ছিল না।

ভাং মেশানো লাড্ডু © wikipedia
সব মিলিয়ে বলা যায়, ভাং ভারতীয় উপমহাদেশে কেবল একটি পানীয় বা খাদ্য উপাদান নয়। এটি হাজার বছরের ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকাচার, চিকিৎসা ধারণা ও খাদ্যসংস্কৃতির সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক অনন্য ঐতিহ্য। সোমরসের মতো হারিয়ে যাওয়া রহস্য থেকে শুরু করে আধুনিক উৎসবের অংশ হয়ে ওঠা ভাং-এর দীর্ঘ যাত্রাপথ ভারতীয় সংস্কৃতির বহুমাত্রিক ইতিহাসকেই স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

