সম্পদের সাথে ক্ষমতার একটি ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য যে কোনো দেশের মতোই বাংলাদেশের অধিকাংশ নারীর ক্ষমতাহীনতার বিভিন্ন কারণের মাঝে সম্পদহীনতা একটি অন্যতম কারণ। যে কোনো সমাজে সম্পদের মালিকানা দুইভাবে সৃষ্টি হয়-সম্পদ ক্রয়ের মাধ্যমে এবং উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদ প্রাপ্তির মাধ্যমে। পাশ্চাত্যের শিল্পোন্নত দেশে ভূমির সহজপ্রাপ্যতা, ব্যক্তির উন্নত ক্রয়ক্ষমতা থাকা ইত্যাদি কারণে উত্তরাধিকারের চাইতে ব্যক্তিগতভাবে সম্পদ সৃষ্টিই সম্পদ মালিকানার প্রধান উপায়।

সমকালীন মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় ভূমির উচ্চমূল্য এবং অপেক্ষাকৃতভাবে দুর্বল ক্রয়ক্ষমতার কারণে কম ক্ষেত্রেই ক্রয়সূত্রে সম্পদ সৃষ্টি ঘটে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা হয় উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্তির মাধ্যমে। পরবর্তীতে উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে প্রাপ্ত সম্পদের সাথে নিজ উপার্জন যোগ হয়ে সম্পদ বৃদ্ধি সহজ হয়।

এ কথা আমরা সবাই জানি, বাংলাদেশের বিবাহ, বিবাহ বিচ্ছেদ, সন্তানের অভিভাবকত্ব, উত্তরাধিকার ইত্যাদি বিষয়গুলোর চর্চায় ব্যক্তি তার নিজস্ব ধর্মীয় আইনের উপর নির্ভরশীল। ইসলাম ধর্মে নারীর উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। ইসলামের যে ন্যায় প্রতিষ্ঠার আদর্শ, সে আলোকে আমরা অনেকেই হয়তো সেই আর্থসামাজিক অবস্থার ভিত্তিতে উত্তরাধিকারের যে জটিল বিভাজন তাকে সহজ করি এবং পুরুষের সাথে সম অধিকারের দিকে যেতে চাই। কিন্তু বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এই সম অধিকারে পৌঁছানো অনেক দূরের বিষয়।

ধর্মমতে যে সম্পদ উত্তরাধিকার সূত্রে নারীর পাবার কথা তা কিন্তু বাংলাদেশের মুসলমান নারীরা বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই অর্জন করতে পারছে না। কিছুদিন আগে আমরা সিদ্দিকীস্ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের পাঁচজন শিক্ষিকা, মধ্যবিত্ত মুসলমান পরিবারে উত্তরাধিকার আইনের প্রয়োগের উপর একটি সীমিত সমীক্ষা করি । এই সমীক্ষায় ৫০ জন নারীর সাক্ষাৎকার নেয়া হয় যাদের পরিবারে পিতৃ বিয়োগ ঘটেছে এবং পারিবারিক সম্পত্তি ছিল। পরবর্তীতে পিতৃ সম্পত্তি সন্তানদের মাঝে বন্টন করা হয়েছে। মধ্যবিত্ত পরিবার ছিল এই সমীক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। ভূ-সম্পত্তি এবং নগদ টাকার বন্টনকেই এখানে দেখা হয়েছে। পিতার ব্যবসা বন্টন বা অন্যান্য বিষয়গুলো আনা হয় নি। সেইসব পরিবারকেই বাছাই করা হয়েছে যেখানে ভাই ও বোন উভয়ই রয়েছে।

সমীক্ষায় সাক্ষাৎকারদানকারীদের বয়স ৩০ থেকে ৪৫ এর মধ্যে। তাদের সর্বনিম্ন শিক্ষাগত যোগ্যতা ইন্টারমিডিয়েট, সর্বোচ্চ মাস্টার্স ডিগ্রিধারী। প্রায় অর্ধেক গৃহিণী এবং বাকি চাকুরী বা অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত।

প্রথমে যে বিষয়টি অনুধাবন করার চেষ্টা করা হয় তা হলো মুসলমান উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে তাদের ধারণা। ৪২% দাবী করেন যে, তারা এ বিষয়ে অবহিত এবং বাকী ৫৮% প্রথমেই বলেন যে এ বিষয়ে তাদের ধারণা ভাসা ভাসা। যারা জানান যে এ বিষয়ে তাদের ধারণা রয়েছে, উত্তরাধিকার আইনের ছক পূরণ করতে গিয়ে দেখা গেলো, আসলে এদের মাঝে একজনেরও সঠিক বন্টনের পরিমান সম্পর্কে জ্ঞান ছিলো না। পিতার মৃত্যুর পরে পিতার বিষয় সম্পত্তি কি ছিলো, সে বিষয়ে সম্পূর্ণ ধারণা ছিলো না ৬৪% এর । পিতার মৃত্যুর পর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, সাকসেশন সার্টিফিকেট বের করা ইত্যাদি বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে অধিকাংশের কোনো অংশগ্রহণ ছিলো না। এগুলো তাদের ভাই বা অন্য কেউ করেছেন।

সম্পদ বন্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে কিভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নিজেদের অংশীদারিত্ব ছিলো কি? এই উত্তরে দেখা যায় যে, ১৪% পরিবারের পিতা জীবিত থাকা অবস্থায় তিনিই বন্টনের ব্যবস্থা করেছেন। ২২% পরিবারে পিতার মৃত্যুর পর মা এবং ভাইয়েরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ৩৮% ক্ষেত্রে শুধু ভাইয়েরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ১৬% ক্ষেত্রে পরিবার বোনদের সাথে পরামর্শ করেছে এবং ১০% ক্ষেত্রে আত্মীয় স্বজনের একটি ভূমিকা ছিলো।

এবার আসা যাক সম্পত্তি বন্টনের প্রশ্নে। সম্পত্তি বন্টনের প্রশ্নে দেখা গেলো যে, ৫৬% উত্তরাধিকার সূত্রে পিতৃ পরিবার হতে কোনো সম্পত্তি পাননি। ৩৮% কিছু সম্পত্তি লাভ করেছেন। বাকিদের বেলায় এখনও ভাগ হয়নি, আর হয়তো হবেও না। যারা সম্পদ লাভ করেছেন, মুসলিম আইন সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ জ্ঞান না থাকলেও উত্তরাধিকার সূত্রে তাদের যেটুকু সম্পদ লাভ করার কথা ছিলো তা তারা লাভ করেননি বলে জানান।

যারা আইন অনুযায়ী সম্পদ লাভ করেননি বা একেবারেই কিছু পাননি, এ বিষয়ে তাদের মতামত জানতে চাইলে তাদের একাংশ বলে ভাইয়ের প্রতি ভালবাসায় খুশি মনে তাদের সম্পত্তির অধিকার তারা ত্যাগ করেছেন, অন্য অংশ বলেন সম্পদ কিভাবে বন্টিত হয়েছে তা জানবার সুযোগ পর্যন্ত তারা পাননি। ৪৬% জানান তাদের পিতৃ সম্পত্তি যেভাবে বন্টন করা হয়েছে তাতে তারা সন্তষ্ট নন। এরা জানান তাদের অসন্তোষ তারা প্রকাশ করেছেন এবং তার ফলে মা এবং ভাই উভয়েই অসন্তুষ্ট হয়েছে। কারো কারো ক্ষেত্রে অবশ্য মা মেয়েদের পক্ষ নিয়েছেন। একটি বড় অংশ জানান তারা অসন্তুষ্ট হলেও তা প্রকাশ করেননি কারণ এতে নিজ পরিবারের সাথে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবে এই আশংকা ছিলো। অর্থাৎ নিজের শ্বশুরবাড়িতে নিজেকে শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে হলে নিজের পিতৃ পরিবারের সাথে সম্পর্ক অবশ্যই ভালো রাখতে হবে। এই অসহায়ত্বের কারণে সম্পদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা তারা করেননি। দেখা যাচ্ছে নারীর সম্পদহীনতা তাকে নিরাপত্তাহীন করে, আবার নিরাপত্তাহীনতার জন্য তারা সম্পদের অধিকার আদায় হতে বিরত থাকেন।

– 

রিফাত আহমেদ

চেয়ারপারসন সিদ্দিকীস্ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল