প্রাচীন ইতিহাসে অনেক গল্পকেই আমরা দীর্ঘদিন ধরে “অতিরঞ্জিত গল্প” বলে মনে করে এসেছি। বিশেষ করে গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাসের লেখা Histories গ্রন্থে স্কিথিয়ানদের সম্পর্কে করা কিছু ভয়ংকর দাবি বহু শতাব্দী ধরে বিতর্কের বিষয় ছিল। স্কিথিয়ানদের সম্পর্কে হেরোডোটাসের সবচেয়ে বিতর্কিত দাবি ছিল, তারা যুদ্ধে জয়লাভের পর শত্রুর দেহ থেকে চামড়া ছাড়িয়ে নিয়ে সেই চামড়া দিয়ে তীর রাখার কিভারের (quiver ) আবরণসহ বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করত। তাঁর মতে, মানব চামড়া ছিল মসৃণ, টেকসই এবং মর্যাদার প্রতীক। এই বর্ণনা এতটাই ভয়ংকর ও অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল যে, দীর্ঘদিন ধরে একে নিছক কল্পকাহিনি বা গুজব হিসেবেই ধরা হয়েছিল। আধুনিক ইতিহাসবিদদের বড় একটি অংশ এই বক্তব্যকে শত্রু জাতিকে বর্বর হিসেবে তুলে ধরার গ্রিক প্রবণতার ফল বলে মনে করেছিলেন।
স্কিথিয়ানরা ছিল ইউরেশিয়ার বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে বসবাসকারী এক যাযাবর যোদ্ধা জনগোষ্ঠী। খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম থেকে তৃতীয় শতাব্দী পর্যন্ত তারা বর্তমান ইউক্রেন, দক্ষিণ রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার বিশাল এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেছিল। ঘোড়সওয়ার যুদ্ধ, নিখুঁত তীরন্দাজি এবং দ্রুত আক্রমণ ছিল তাদের সামরিক শক্তির মূল ভিত্তি। তাদের সমাধি বা কুরগান থেকে উদ্ধার হওয়া অস্ত্র, অলংকার ও দৈনন্দিন ব্যবহারের সামগ্রী প্রাচীন এই জাতির জীবনযাপন ও সংস্কৃতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়।

হিরোডোটাস এর মূর্তি © wikipedia
তবে সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা এই যাযাবর জাতি সম্পর্কে প্রচলিত ধারণায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। ২০২৩–২০২৪ সালে প্রত্নতত্ত্ববিদ ও জীববিজ্ঞানীরা স্কিথিয়ানদের সমাধি থেকে পাওয়া প্রায় ২,৪০০ বছর পুরোনো চামড়ার ৪৫টি নমুনা বিশ্লেষণ করেন। আধুনিক প্রোটিন বিশ্লেষণ পদ্ধতির মাধ্যমে তারা নির্ধারণ করার চেষ্টা করেন, এসব চামড়া আসলে কোন প্রাণীর চামড়া থেকে তৈরি।
গবেষণার ফলাফল ছিল বিস্ময়কর। অধিকাংশ নমুনা ঘোড়া, গরু, ভেড়া বা ছাগলের চামড়া থেকে তৈরি হলেও দুটি নমুনা স্পষ্টভাবে মানুষের চামড়া হিসেবে শনাক্ত হয়। এই চামড়া পাওয়া গেছে তীর রাখার কিভারের অংশে, যা হেরোডোটাসের বর্ণনার সঙ্গে সরাসরি মিলে যায়। এর ফলে শতাব্দী ধরে অবিশ্বাস করা একটি দাবির পেছনে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পাওয়া গেল।
তবে গবেষকেরা এটাও স্পষ্ট করেছেন যে, মানুষের চামড়া ব্যবহার স্কিথিয়ানদের মধ্যে কোনো সাধারণ বা নিয়মিত প্রথা ছিল না। মাত্র অল্প কয়েকটি নিদর্শনে এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি ছিল বিশেষ কোনো প্রতীকী কাজ—হয়তো যুদ্ধজয়ের স্মারক, শত্রুর ওপর আধিপত্য প্রদর্শন অথবা ব্যক্তিগত গৌরবের নিদর্শন।

গবেষণায় জানা গেছে, ২,৪০০ বছর পুরোনো এই তীর রাখার থলিটি আংশিকভাবে মানুষের চামড়া দিয়ে তৈরি ছিল। © Marina Daragan
স্কিথিয়ানদের মানুষের চামড়া ব্যবহারের ঘটনা দেখিয়ে দেয়, ইতিহাস অনেক সময় আমাদের কল্পনার চেয়েও বেশি নির্মম, জটিল এবং বিস্ময়কর। একই সঙ্গে এই আবিষ্কার ইতিহাসচর্চার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। প্রাচীন লেখকদের সব কথাকে যেমন অন্ধভাবে বিশ্বাস করা ঠিক নয়, তেমনি সব বর্ণনাকে অতিরঞ্জন বলে একেবারে বাতিল করাও সঠিক পদ্ধতি নয়। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আজ ইতিহাসের বহু বিতর্কিত দাবিকে নতুন আলোয় যাচাই করার সুযোগ করে দিচ্ছে।