প্লিনি দ্য ইয়াংগার ছিলেন প্রাচীন রোমের একজন প্রখ্যাত লেখক, আইনজীবী ও সিনেটর। তার জীবদ্দশায় তিনি বহু চিঠি লিখেছিলেন। তার এই চিঠিগুলো খুব ভালোভাবে সংরক্ষিত থাকার কারণে রোমান সাম্রাজ্যের সামাজিক রাজনৈতিক জীবনের নানা রকম খুঁটিনাটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পর্কে আমরা অবগত হতে পারি। এগুলো শুধু ব্যক্তিগত কিছু চিঠি নয়, এর মধ্যে থেকে খুঁজে পাওয়া যায় সাহিত্যের নানারকম উপকরণ। তার পাঠানো চিঠিগুলোর উত্তরগুলো থেকেও রোমান সাম্রাজ্য সম্পর্কে আমরা ধারণা পাই। বিশেষ করে সম্রাট ট্রাজানের ( Trajan) কাছে লেখা ব্যক্তিগত চিঠিগুলোর উত্তর থেকে আমরা সমাজের নানাদিক সম্পর্কে জানতে পারি। এই মানুষটির পুরো নাম ছিল “গায়ুস প্লিনিয়াস কাইসিলিয়াস সেকান্ডাস” (Gaius Plinius Caecilius Secundus) তিনি উত্তর ইতালির কোমু শহরের এক বিখ্যাত সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার মৃত্যুর পর তিনি তার চাচা, প্লিনি দ্য এল্ডারের সঙ্গে দক্ষিণ ইতালির মিসেনামে বসবাস করতে শুরু করেন। প্লিনির চাচা প্রাকৃতিক ইতিহাস বিষয়ক এনসাইক্লোপিডিয়া লেখক হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন। তবে দুর্ভাগ্য এই যে ৭৯ খ্রিস্টাব্দে ভয়াল কালোগ্রাসী ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
রোমে উচ্চশিক্ষা অর্জনের পর তিনি রাজনীতি ও আইনের জগতে প্রবেশ করেন। ১০০ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে তিনি কনসাল নির্বাচিত হন। রোমান সাম্রাজ্যের বিথিনিয়া-পন্টাস (Bithynia et Pontus) প্রদেশের গভর্নরের দায়িত্বও তিনি পালন করেন। ১১২ খ্রিস্টাব্দে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পরে একটি শিলালিপি থেকে তার বিশাল সম্পদের বর্ননা পাওয়া যায়। অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন তিনি। জনগনের সুবিধার জন্য পাবলিক স্নানাগার এবং গ্রন্থাগার তৈরির ক্ষেত্রেও প্রচুর অর্থ দান করেন।

ইতালির কোমো শহরের সান্তা মারিয়া মাজিওরে ক্যাথেড্রালের সম্মুখভাগে প্লিনি দ্য ইয়ঙ্গারের মূর্তি, ১৪৮০ সালের পূর্বে নির্মিত © Britannica
সেই সময় রোমান সাম্রাজ্যের দাসদের কোনো আইনগত অধিকার ছিল না; তারা মালিকের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হতো। দাসদের মুক্তির ব্যবস্থা করেন তিনি। দাসদের শুধু মুক্তি দিয়েই ক্ষান্ত হননি, তাদের জীবন সহজ করার জন্য নানারকম সহায়তাও করেন। তিনি দাসদের উইল করার অনুমতি দেন এবং প্রয়োজনে তাদের স্বাধীনতাও প্রদান করেন। তার মুক্তি দেওয়া দাস জোসিমাস যখন অসুস্থ হয় তখন তিনি খুব উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেন। জোসিমাসের প্রতি তার আন্তরিক ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার কথা তিনি স্পষ্টভাবে চিঠিতে উল্লেখ করেন।
শিশুদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও তিনি উদার হাতে অর্থ দান করেন। একটি চিঠিতে প্লিনি একজন নিষ্ঠুর প্রভু লার্সিয়াস ম্যাসেডোর ( Larcius Macedo) গল্প বলেন। যিনি দাসকে অত্যন্ত অত্যাচার করতো এবং দুর্ভাগ্যক্রমে তার নিষ্ঠুরতার জন্য তার দাসরাই তাকে এক পর্যায়ে হত্যা করে।
প্লিনির চিঠি থেকে কিন্তু নারীদের সম্পর্কেও নানারকম তথ্য পাওয়া যায়। অধিকাংশ সাহিত্যে নারীদের বর্ণনাগুলো পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই তুলে ধরা হতো। সে সময়ে নারীদের কাজ ছিল সবসময় একজন আদর্শ স্ত্রীর ভূমিকা পালন করা। স্বামীদের প্রতি অনুগত থাকা এবং উত্তরাধিকারের জন্ম দেওয়া। তবে কিছু নারী আবার ব্যতিক্রমও ছিল। তিনি যখন বিথিনিয়া-পন্টাস প্রদেশের গভর্নর ছিলেন তখন প্রদেশের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে সরাসরি সম্রাট ট্রাজানকে চিঠি দিয়ে রাষ্ট্রের খবর জানাতেন। তার মৃত্যুর পর ঐ চিঠি গুলো নিয়ে দশ খন্ডের একটি সংকলন প্রকাশিত হয়। চিঠির উত্তরের বইগুলো ট্রাজানের কাছে সংরক্ষিত ছিল।

অ্যাঞ্জেলিকা কফম্যানের ‘খ্রিষ্টাব্দ ৭৯ সালে মিসেনামে প্লিনি দ্য ইয়াঙ্গার ও তার মাতা’, ১৭৮৫, © Britannica
চিঠি থেকে জানা যায় খ্রিস্টান ধর্মের মানুষেরা সেইসময় গান গাওয়া, উপবাস করা, ঈশ্বরের প্রতি শপথ নেওয়া এই সমস্ত বিষয়গুলোর প্রতি খুবই মনোযোগী ছিলেন। আর এই জিনিসগুলো প্লিনিকে বিরক্ত করে তুলেছিল। তিনি ভাবতেন এগুলো বিকৃত আচার ব্যবহার। অবাক লাগে দাস এবং দাস মুক্তির প্রতি সহানুভূতিশীল এই মানুষটি খ্রিস্টানদের বিষয়ে ছিল অত্যন্ত কঠোর সমালোচক। খ্রিস্টধর্মের বিরুদ্ধেই ছিল তার মতামত এবং খ্রিস্টধর্মের মানুষগুলোকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি পক্ষপাতী ছিলেন। খ্রিস্টধর্ম তখন কোন বৈধ ধর্ম ছিল না। ৩১৩ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট কনস্টান্টাইনের এডিক্ট অফ মিলান ঘোষণার মাধ্যমে এই ধর্মের বৈধতা দেওয়া হয়। তিনি চাইতেন না খ্রিস্টধর্মের অনুসারীদের সংখ্যা বাড়ুক এবং যদি কেউ খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে এবং পরে যদি আবার নিজ ধর্মে ফিরতে চায় তখন কতটা শাস্তি দিয়ে আবার তার ধর্মে ফেরত আনা যায় সেই সম্পর্কেও তার মতামত ছিল।

রোমান দাস বালকের মার্বেল মূর্তি, খ্রিস্টাব্দ ১ম-২য় শতাব্দী © Met Museum
ভিসুভিয়াসের অগ্নুৎপাতের বিশদ বর্ণনা আমরা এই চিঠি গুলো থেকে পাই। বন্ধু টাসিটাসকে একটি চিঠিতে এই অগ্নুৎপাতের করুন বর্ণনা তিনি দিয়েছিলেন। প্লিনির চাচা এই ভিসুভিয়াসের অগ্নুৎ্পাতের সময়ই মৃত্যুবরণ করেন। চিঠির মাধ্যমেই আমাদের চোখের সামনে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠে দুর্ঘটনার দিনটি। অগ্নুৎপাতের আগে প্রথমেই বিশাল একটি ছাতার মত করে ধোঁয়ার মেঘ উঠেছিল। প্লিনির চাচা একটি নৌকা করে আশপাশের বাড়িতে নৌকায় করে গিয়ে তাদের সাহায্যের চেষ্টা করেন। অগ্নুৎপাতের শুরুতে চারদিকে যখন বিপর্যস্ত তখন নিরাপদ আশ্রয় খোজার জন্য তিনি ব্যস্ত হয়ে পরেন। বাড়িগুলোতে আশ্রয় নেওয়া মানুষগুলোর মনকে শান্ত রাখবার জন্য তিনি তাদের রাতের খাবার সরবরাহ করেন, তাদের সাথে খাবার খান, গল্প করেন, তাদের সাথে বসেই শক্তি যোগান তিনি । কিন্তু এক পর্যায়ে রাতের বেলায় আগুন বারাবাড়ি রকমের ছড়িয়ে পরতে থাকে এবং ঘরবাড়ি পুরে যেতে থাকে। উপায়ন্তর না দেখে সৈকতের দিকে গিয়ে তারা পালাবার পথ খুঁজতে থাকেন। কিন্তু তাদের আর ফিরে আসা হয়নি। পরে তাদের মৃতদেহ একসময় সৈকতে নির্জীব অবস্থায় পরে থাকতে দেখা গিয়েছে । মনে করা হয় বিষাক্ত ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে তিনি মারা গিয়েছিলেন।

“জে. এম. ডব্লিউ. টার্নারের ‘ভেসুভিয়াসের বিস্ফোরণ’, প্রায় ১৮১৭-১৮২০, ইয়েল সেন্টার ফর ব্রিটিশ আর্ট সংগ্রহে
পরিশেষে বলা যায় তার এই চিঠিগুলো আমাদের ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা পেতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পর্কে তার ব্যক্তিগত মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা এই চিঠিগুলো এক দলীল হিসেবে বর্তমান সময়ের মানুষগুলোকে সাহায্য করছে। প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ভূতত্ত্ববিদদের গবেষণার জন্য তার লেখাগুলো দিকনির্দেশনার কাজ করে। প্লিনি ছিলেন একজন দক্ষ বক্তা এবং একজন মরমি সাহিত্যিক, সেই সাথে সাথে দক্ষ আইনজীবী রাজনীতিবিদ, এবং লেখক। তার এই কাজগুলো, চিঠিগুলো এবং বক্তৃতা গুলো প্রাচীন রোমান সমাজের প্রশাসন, ধর্ম, নানরকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি সম্পর্কে জানতে সাহায্যে করে। তার লেখা আজও ইতিহাস প্রেমী লেখকদের জন্য অমূল্য সম্পদ।

রোমান চিঠিপত্র লেখার সেট, মোমের লেখার ট্যাবলেট, ব্রোঞ্জ ও হাতির দাঁতের কলম (স্টাইলাস) এবং কালির শিশি সহ, খ্রিস্টাব্দ প্রথম-চতুর্থ শতাব্দী, © the British Museum

