১৭৫৭ সাল। মেহেরপুর সদর থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে প্রায় ৭৭ একর জায়গা জুড়ে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক কুঠিবাড়ি। ১৫ টি সাধারণ ঘর ছাড়া রয়েছে একটি নাচ ঘর, খাবার ঘর, হল রুম এবং গেস্টে রুম। এগুলোরই কোন একটি ঘরে মুখোমুখি দুটি চেয়ারে বসে আছেন দুইজন ব্যক্তি। একজন ভারতীয় এবং আরেকজন ব্রিটিশ। দুজনের মাঝে সেদিন যে আলোচনা হয়েছিলো সেটিকে ষড়যন্ত্র বললে ভুল হবে না। হ্যাঁ ষড়যন্ত্র, উপমহাদেশের ইতিহাসকে চিরতরে বদলে দেবার ষড়যন্ত্র। দুঃখজনক বিষয় হলো সেদিনের সেই ষড়যন্ত্র প্রচণ্ডভাবে সফল হয়েছিলো। একটি ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের মতই ২০০ বছরের জন্য বদলে গিয়েছিলো ভারতবর্ষের নিয়তি। কারণ আমঝুপি কুঠিবাড়ির সেই ঘরে সেদিন যে দুজন ব্যক্তি জঘন্য এক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে উপমহাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ করেছিলেন, তাদের একজন হলেন রবার্ট ক্লাইভ এবং অপরজন মীরজাফর। তেমনই এক নীল কুঠির গল্প বলবো আজ।
১৮৫৯ সাল। ইংল্যান্ড থেকে কলকাতায় পৌঁছালো একজন ব্রিটিশ তরুণ। তার গন্তব্য যশোরে। কলকাতা তুলনামূলকভাবে উন্নত এলাকা হলেও এদেশের মানুষ এখনো ভীষণ দরিদ্র। কি আশ্চর্য! ১০০ বছর আগেও ছিল ঠিক উল্টো ঘটনা। তখন বরং এ দেশের মানুষই ছিল সবচেয়ে ধনী। ভ্রমণরত অবস্থায় এই সবই ভাবতে থাকে ব্রিটিশ তরুন। প্রায় ১০০ বছর আগে ঘটে যাওয়া পলাশীর যুদ্ধ সম্পূর্ণভাবে বদলে দিয়েছে এ দেশের ইতিহাসকে। সে সময় ব্রিটিশদের ক্ষমতায়ন না হলে হয়তো আজ এখানে তার আসাও হতো না।

আমঝুপি নীলকুঠি © Daily news reel
হ্যাঁ, ভারতবর্ষের স্বর্ণভূমি বলেই তো আজ এত লম্বা সফর পার করে এখানে এসেছে ছেলেটি, এসেছে জীবনের চূড়ান্ত সফলতা লাভের আশায়। সে জানে কষ্ট করে কয়েক বছর এখানে থাকতে পারলেই ধনী হতে পারবে সে। যশোর থেকে আরো প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে সে পৌঁছালো মেহেরপুরের কুঠিবাড়িতে। মেহেরপুরের অসংখ্য নীলকুঠির মধ্যে এটি অন্যতম। নীল চাষের তদারকির জন্যই জায়গায় জায়গায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য নীলকুঠি।
নীলকুঠি দেখে তো ব্রিটিশ ছেলেটি হতবাক। বিশাল এই কুঠি বাড়িতে ঘরের কোন অভাব নেই। বাড়ির সামনে ও পেছনে দুই জায়গাতেই রয়েছে প্রবেশপথ। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কাজলা নদী। এখানেই নিয়োগ পেয়েছে সে ইংল্যান্ড থেকে। আপাতত এখানকার অতিথি রুমে তার ঠিকানা। মনিব গিয়েছেন কলকাতা। দুদিন বাদে ফিরবেন। তখন নিজের কাজ বুঝে নেবে সে। মনিব ফেরার পর অন্দরমহলে ডাক পড়লো তার। এই প্রথম নীলকুঠির ভেতরে প্রবেশ করলো সে।
১৫-২০ টি ঘর, বাড়ির পাশেই সার্ভেন্টরুম, বাবুর্চি খানা, আরেকটি কয়েদি ঘর। গরিব প্রজাদের শাস্তি দেবার জন্যই তৈরি হয় সে ঘর। কি ধরনের শাস্তি, তা সে তখনও জানে না। তবে মনে খটকা তৈরি হয়েছে। বুঝতে পারে সে, এত ফুর্তি এত জৌলুশের মাঝেও কোথাও কিছু একটা ঠিক নাই। মনের সেই খচখচে ভাবের জবাব ছেলেটি অল্প কয়েক দিন পরই পেল । বিশাল একটি ঘরে বসানো হলো তাকে। মুগ্ধ বিস্ময়ে চারপাশ দেখতে লাগলো ছেলেটি। সৌখিনতার আঁচ পাওয়া যায় পুরো বাড়িটির আনাচে-কানাচে। বিশেষ করে আসবাবপত্রে। পাশেই নাচ ঘর। এই ঘরকে কেউ বলে হলঘর। নাচ ঘরে রয়েছে বেলোয়ারি ঝাড়বাতি। ৬৫ টি বাতি ঝুলে আছে ঐ ঝলমলে ঝাড়বাতিটিতে। বেলজিয়াম কাঁচের বিশাল আয়না। দেয়ালে শোভা পাচ্ছে বিশ্ব বিখ্যাত চিত্র শিল্পী মাইকেল এঞ্জেলো ও রেমব্রান্তের আঁকা ছবিগুলোর নকল। পরে শুনতে পেয়েছে বড় দিন বা ক্রিস্টমাসের সময় দেশীয় ও ইউরোপীয় নানা সম্ভান্ত্র ব্যক্তিদের দাওয়াত থাকে ঐ বাড়িতে। অনুষ্ঠিত হয় বাইজির চোখ ধাধানো নাচ। মেহগনি কাঠের তৈরি মজবুত চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরে ঢুকে অর্থবিত্তের চাকচিক্য দেখে ঘোর লাগলো তার। ঘোর কাটলো পেয়াদার ডাকে। সাহেব ডাকছেন। বুঝিয়ে দেয়া হলো তার দায়িত্ব। নীল চাষের তদারকির দায়িত্ব। কাজের কারণে পুরোটি বাড়ি তার দেখা হয়ে গেল। আসা যাওয়ার পথে তার সাথে পরিচয় হয় ঐ বাড়ীর মালিকের মেয়ের সাথে। ছেলেটির কাছ থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন গল্প শোনে সে। বই পড়তে ও গল্প করতে পছন্দ করে সে। আমেরিকার যুদ্ধ নিয়ে জানতে চায়। বেশ মিষ্টি মেয়েটি। স্বাধীনচেতাও বটে। বন্ধুত্ব হল তাদের। ভারতবর্ষে নীল চাষ কেবলই চাষ ছিলো না, ছিলো তার চেয়েও হাজার গুণ নিষ্ঠুর এক প্রক্রিয়া।

আমঝুপি নীলকুঠি © Daily news reel
ভারতবর্ষের উর্বর মাটিতে নীলের ফলন হতো সবচেয়ে ভালো। আর আঠারো শতকের শিল্প বিপ্লবের পর থেকে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে ইংল্যান্ডে নীলের চাহিদা বেড়েছে ব্যাপকভাবে। তাই ক্ষমতাসীন ব্রিটিশরা নীল চাষে এক রকম বাধ্য করেছে এ দেশের চাষীদেরকে। প্রথম দিকে চাষীরা নিজেরাই আগ্রহী ছিলো নীল চাষে। কিন্তু যখন তারা দেখলো এতো পরিশ্রমের একটি কাজের বিনিময়েও তারা একদমই লাভবান হচ্ছে না, উল্টো না খেয়ে মারা যাবার উপক্রম হচ্ছে, তখন এই নীল চাষে অনীহা শুরু হলো চাষীদের। কিন্তু চাষীদের সম্মতি কিংবা অসম্মতিতে সাহেবদের কিছুই যেতো-আসতো না। নীল চাষে অনীহা প্রকাশকারীকে ভোগ করতে হতো অকথ্য নির্যাতন। আর অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই ছেলেটি অবাক হয়ে আবিষ্কার করলো নীলকুঠিতে দেখা সেই কয়েদ ঘরটি আসলে ব্যবহার হতো টর্চার সেল হিসেবে। অর্থ-বিত্তের নেশায় যেনো উন্মত্ত হয়ে উঠেছিলো সাহেবরা। নীলচাষীদের উপর অবর্ণনীয় অত্যাচার তো ছিলো নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা, সেই সাথে তাদের পরিবারের নিরীহ মানুষগুলোও রেহাই পেতো না এদের হাত থেকে। চাষীদের গরু- বাছুর সব নিয়ে আসা হতো জোর করে। আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হতো তাদের ঘরবাড়ি। তুলে নিয়ে আসা হতো তাদের স্ত্রী ও কন্যা সন্তানদের এবং তাদের উপর চলতো শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। এসব রমণীদের মধ্যে অনেকে অপমানের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করতেন, অনেকে আবার সমাজে পরিত্যক্ত হবার আশঙ্কায় নিজ ইচ্ছায় সাহেবদের মেম হয়ে রয়ে যেতেন।
নীলকরদের এসব অত্যাচার-নির্যাতনের নমুনা দেখে দেখে ত্যক্ত হয়ে ওঠে সদ্য নিয়োগ পাওয়া ছেলেটি। সে ভেবে পায় না কেনোই বা এই অত্যাচারের সাক্ষী হতে এ দেশে এলো সে। এক প্রচ্ছন্ন অপরাধবোধ ঘিরে ধরে ছেলেটিকে। ছেলেটি সবচেয়ে অবাক হয় সেই মেয়েটির কথা চিন্তা করে, যাকে প্রথম দেখাতেই ভালো লেগেছিলো তার। কি মিষ্টি সেই মেয়েটি! কিন্তু এতো সব টর্চার তো তার শ্রবণসীমা কিংবা দৃষ্টিসীমার বাইরে হচ্ছে না। কি করে নির্বিকার রয়েছে সেই মেয়েটি? হয়তো উন্মত্ত সাহেবদের এই উন্মত্ততাই এখন স্বাভাবিক ঘটনা তার কাছে। শত-সহস্র ভাবনা ক্রমেই গ্রাস করে নিতে থাকে ছেলেটিকে।

নীলকুঠির স্থাপত্যশৈলীতে ইউরোপীয় ধাঁচ, ডাক বহন কারি পাখির খাঁচা © Daily news reel
কাজলা নদীর তীরে নির্মল পরিবেশে বসবাস করলেও একাকীত্ব ঘিরে ধরে ব্রিটিশ ছেলেটিকে। নিজের পরিবার ও আপনজনদের রেখে কতোই না দূরে বসে আছে সে! নিজের মনেই ভাবে ছেলেটি, জীবনের মানে কি শুধুই বিত্তশালী হওয়া কিংবা ক্ষমতাবান হওয়া? উত্তরও খুঁজতে থাকে নিজের মনেই। ব্রিটিশ শাসনের আগে জমিগুলো রাষ্ট্রের অধীনে ছিল। জমি চাষের জন্য কৃষকদেরকে পর্যাপ্ত ঋণ দেওয়া হতো রাষ্ট্র থেকে। কিন্তু নীলকরদের কাছ থেকে পাওয়া ঋণের টাকা শোধ করতে গিয়ে চাষীরা নিজেদের খাবারেরও যোগান দিতে পারতো না, অথচ নীল চাষ করতে বাধ্য করা হতো তাদের। এভাবেই সময় কাটছিলো! একসময় ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল চাষীদের। অতিষ্ঠ হয়ে প্রশাসনের সাহায্য চাইলো তারা। কিন্তু প্রশাসনও ব্রিটিশদের পক্ষে বলে কোন নালিশেই ন্যায়বিচার পেল না কৃষকরা। ব্রিটিশ ছেলেটি অবাক হয়ে লক্ষ্য করল এক অমানবিক জগৎ গড়ে তুলছে ইংরেজরা এই ভারতবর্ষে। চাষীদের হার-জিরজিরে শরীরে সে কখনোই মাংস দেখেনি। চাষীদের প্রতি নীলকর ও প্রশাসনের করা অন্যায়ের বিরুদ্ধে যারা প্রশ্ন তুলতো সেই সব প্রশাসকদের বদলি করে দেয়া হতো অন্য জায়গায়। সেই সময়ই কলম তুলে ধরলেন বাঙালি সাহিত্যিকরা। শুরু করলেন নীল চাষের অত্যাচার নিয়ে লেখালেখি।
১৮৬০ সাল। দীনবন্ধু মিত্র লিখে ফেললেন ‘নীলদর্পণ’। নীল চাষ ও নীলকরদের অত্যাচার নিয়ে রচিত এই নাটকটিকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে ফেললেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। এই ইংরেজি অনুবাদটি প্রকাশ করলেন শান্তিকামী পাদ্রী রেভারেন্ড জেমস লং। ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে পাঠানো হলো বইটিকে। সেই সাথে আরেকটি কেইস এলো ইংল্যান্ডে। কোনো এক নীলচাষীর গৃহবধূকে শারীরিক নির্যাতন করতে গিয়ে মেরে ফেলেছে নীলকররা। এই ঘটনার পর আক্রোশে ফেটে পড়লো দেশবাসী। শুধু ভারতবর্ষেই নয়, ভারতবর্ষের বাইরেও শুরু হলো আন্দোলন। বাধ্য হয়ে নীলকরদের অত্যাচারে নিয়ন্ত্রণ আনবার জন্য ‘ইন্ডিগো কমিশন’ গঠন করলো ব্রিটিশ সরকার।

মেহেরপুরের ভাটপাড়া নীলকুঠির মূল ভবন © সমকাল
এবার ফিরে আসা যাক মেহেরপুরের সেই নীলকুঠিতে। ১৮৬০ সালের সেই দাউদাউ করে জ্বলে ওঠা বিদ্রোহের আগুনে পুড়ে গিয়েছিলো সেই নীলকুঠির আঙিনা। সম্মুখযুদ্ধ হয়েছিলো ব্রিটিশ ও বাঙালি চাষীদের মাঝে। কাজলা নদীর নির্মল তীর হয়েছিলো রক্তাক্ত। সেখানে মিলেমিশে একাকার হয়েছিলো বাঙালি ও ব্রিটিশ রক্ত। শত শত লাশের মাঝে একটি লাশ ছিলো সুদূর ইংল্যান্ড থেকে আসা এক ব্রিটিশ তরুণের, যার মনে ঘৃণা ও অহমিকাবোধ জায়গা করে নিতে না পারলেও কিছু না করতে পারার অক্ষমতার বোঝা বয়ে চলছিলো সে প্রতিনিয়ত। এ দেশের নামবিহীন অজস্র ব্রিটিশ কবরের একটিতেই হয়তো শেষ পর্যন্ত জায়গা হয়েছিলো পরিবার-পরিজন ছেড়ে বহুদূরের এক দেশে পাড়ি জমানো সেই ছেলেটির।

