বিশ্বের ইতিহাসে এক জাতির আবির্ভাব হয়েছিল। তারা ঝড়ের মতন এসে আলোড়ন তুলেছিল গোটা নিকটপ্রাচ্যে। তাদের নাম সিথিয়ান। তারা ছিলেন যাযাবর তৃণভূমিতে ঘুরে বেড়ানো অশ্বারোহী। তাদের হাতের বাঁকানো ধনুক আর তীক্ষ্ণ তীর ছিল নিশ্চিত মৃত্যুর দূত। এই যাযাবর জাতি কয়েক দশকের মধ্যে এতটা শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল যে যুদ্ধবাজ শক্তিশালী আসিরীয়রাও তাদেরকে ভয় পেতে শুরু করেছিল। আশ্চর্যের বিষয় এত শক্তিশালী একটি দলের সাম্রাজ্য স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ২৮ বছর। তারপর ইতিহাসের বই থেকে উল্কাপিণ্ডের মতো হারিয়ে গিয়েছিল তাদের জ্যোতি।
সিথিয়ানরা ছিল মূলত ইরানীয়ভাষী ইন্দো-ইউরোপীয় গোষ্ঠী। তারা কোনো একক জাতি নয়; বিশাল ইউরেশীয় তৃণভূমি জুড়ে অসংখ্য দলে বিভক্ত ছিল তারা। কারো ছিল ঘোড়ার পাল, কারো ছিল যুদ্ধের দল। গ্রিকরা তাদের বলত সিথিয়ান, আর পুরোনো ফারসি ভাষায় তারা পরিচিত ছিল সাকা নামে। সিথিয়ানদের সংস্কৃতি ও বিশ্বাস বুঝতে গবেষকদের যথেষ্ট কষ্ট হয়েছে। কারণ তারা লিখতে জানত না। তারা নিজেদের ইতিহাস নিজেরাই সংরক্ষণ করতে পারেনি। আজ আমরা তাদের সম্পর্কে যতটুকু জানি তা পাই হেরোডোটাসের লেখায়, আসিরীয়দের রাজকীয় দলিল আর সমাধি টিলায় খুঁড়ে পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে।

স্কিথিয়ান বিস্তৃত ভূখণ্ডের মানচিত্র, খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৭০০–৩০০
তাদের জীবনযাত্রা ছিল প্রকৃত যাযাবরের মতো। ঘোড়া, অস্ত্র আর বিস্তীর্ণ প্রান্তরই ছিল তাদের আসল ভরসা। ছোট ছোট তাঁবুতে পরিবার নিয়ে তারা চলাফেরা করত। চারণভূমি পেলে সেখানেই থেমে যেত, আবার নতুন জায়গার খোঁজে ছুটে যেত দূরে। যুদ্ধে তাদের সবচাইতে বড় অস্ত্র ছিল দ্রুততা এবং নৃশংসতা। মুহূর্তে তারা শত শত ঘোড়সওয়ার নিয়ে আক্রমণ করত, শত্রু সামলে ওঠার আগেই দমকা হাওয়ার মতো মিলিয়েও যেত। এ কারণেই তাদের মোকাবিলা করা প্রায় অসম্ভব ছিল। হেরোডোটাসের লেখা থেকে জানা যায় সিথিয়ান যোদ্ধারা প্রথম যে শত্রুকে হত্যা করত, তার রক্ত তাদেরকে পান করতে হত। শত্রুর মাথা কেটে রাজাকে দেখাতে পারলেই যুদ্ধে প্রাপ্ত লুটের অংশ তারা পেত। কখনো তারা শত্রুর চামড়া লাগিয়ে তৃণ বানাত।
ধর্মবিশ্বাসেও তারা ছিল স্বতন্ত্র। তারা বহু দেবদেবীর পূজা করত। আগুনের দেবী টাবিটি ছিল তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ দেবী। তাকে তারা গৃহ এবং পরিবারের রক্ষক মনে করত। নদীও তাদের কাছে ছিল পবিত্র। বিশেষ করে দ্নিপার নদীকে তারা জীবনের প্রতীক হিসেবে মানত।

সিথিয়ান যোদ্ধা © worldhistory.org
মৃত্যুর পরের জীবনে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল তাদের। এই বিশ্বাস থেকেই গড়ে উঠেছিল কুরগান নামে বিশাল সমাধি টিলা। তারা জাঁকজমকপূর্ণ সমাধির উপরে উঁচু কবর বানাত। এগুলোর ভেতরে ছিল সযত্নে বানানো কক্ষ, সেখানে কবর দেওয়া হতো কেবল মানুষকেই নয়, তার ঘোড়া, অস্ত্র, অলংকার, খাদ্য সবকিছুই। কারণ তারা ভাবত, মৃত্যু মানেইতো শেষ নয়, বরং এক নতুন যাত্রা, যেখানে প্রিয় ঘোড়া আর যুদ্ধের সরঞ্জামও প্রয়োজন হবে।
এসব সমাধির ভেতরে থাকতো একটি কেন্দ্রীয় কক্ষ, আর তার চারপাশে ছোট কক্ষ। এগুলো সাধারণত অভিজাত বা উচ্চপদস্থ সিথিয়ানদের জন্য বানানো হত। চমকপ্রদ বিষয় হলো, সিথিয়ানদের সেনাবাহিনীতে নারীদেরও বিশেষ স্থান ছিল। প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ যোদ্ধাই ছিল নারী। তারা পুরুষদের মতো ঘোড়ায় চড়ত, ধনুক ধরত, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দিত। এই নারীযোদ্ধাদের কাহিনি হয়তো গ্রিকদের কাছে গিয়ে রূপ নিয়েছিল কিংবদন্তি অ্যামাজন নারীর গল্পে।

স্কিথিয়ান স্বর্ণালঙ্কার (পেক্টোরাল) © worldhistory.org
খ্রীস্টপূর্ব নবম ও অষ্টম শতাব্দীতে তারা পানটিক কাসপিয়ান তৃণভূমি থেকে দক্ষিণে নেমে এসেছিল। প্রথমে তারা অ্যানাটোলিয়া প্রবেশ করে সেখানে সুমেরীয় নামক আরেকটি যাযাবর জাতির মুখোমুখি হয়। পরে দক্ষিণে আসতে আসতে তারা শক্তিশালী আসিরীয় বাহিনীর সংস্পর্শে আসেন। প্রথমে আসিরীয়দের সাথে তাদের সংঘর্ষ হলেও পরে কিন্তু তারা জোটও বাঁধে।
খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর দিকে যখন আসিরীয় সাম্রাজ্য ভেতরে ভেতরে দুর্বল হয়ে পড়ছিল, তখন সিথিয়ানরা সুযোগ নেয়। তাদের দ্রুত আক্রমণে পশ্চিম এশিয়ার অনেক রাজ্য কেঁপে ওঠে।
তাদের সাথে সন্ধি করতে বাধ্য হয়েছিল আসিরীয়ান রাজারা। তবে কিছুদিন পরেই তারা পূর্বদিকে নজর দেয়। তখন মিডিয়ার রাজারা শাসন করছিল। হেরোডোটাসের মতে তারা এক মিডিয়ার যুদ্ধে পরাজিত করে পুরো এশিয়াই নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছিল।
কিছুদিনের জন্য তারা শাসন করেছিলেন গোটা পশ্চিম এশিয়া। আধুনিক ইরান তুরস্ক থেকে শুরু করে সিরিয়ার দিকেও ছড়িয়ে গিয়েছিল তারা। দারিয়ুস প্রথম নিজেই সিথিয়ানদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। তার বিখ্যাত বেইস্থান শিলালিপিতে যুদ্ধের বিবরণ রয়েছে। যেখানে তিনি সিথিয়ান রাজাকে বন্দি করে হত্যা করেন। এবং নিজের পছন্দ মত আরেকজন রাজাকে সেখানে বসিয়ে দেন।

সিথিয়ানদের চেহারা, পোশাক, অস্ত্র ও অলংকারের বিভিন্ন ধারা তুলে ধরা একটি সমন্বিত চিত্র, যা স্কিথীয় সমাধিস্থল থেকে পাওয়া প্রমাণের ভিত্তিতে তৈরি।
যাদের শক্তি কেবল আক্রমণ আর লুণ্ঠনে তাদের রাজত্ব কিন্তু টিকেনি বেশিদিন। ক্রমাগত যুদ্ধ, অভ্যন্তরীণ বিভেদ আর স্থানীয় রাজাদের প্রতিরোধে ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে তাদের শক্তি। আক্রমণের ঝড় একসময় থেমে যায়। সিথিয়ানরা আবার ফিরে যায় সীমাহীন তৃণভূমিতে। আর কেউ কেউ ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে কাজ করতে শুরু করে অন্য রাজ্যের রাজাদের জন্য। সাম্রাজ্যের জ্যোতি নিভে গেলেও ইতিহাসে রয়ে গিয়েছে এই যাযাবর জাতির উত্থান পতনের কাহিনি। আজ তাদের গল্প লুকিয়ে আছে বিভিন্ন ধরনের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে , হেরোডোটাসের লেখায় এবং আসিরীয়দের মাটির ট্যাবলেটে l

