ক্যাট ও নাইন টেইলস ছিল এক ভয়ংকর শাস্তির চাবুক। নামের কারণ খুব সহজ। এতে ছিল নয়টি আলাদা দড়ির লেজ, আর প্রতিটি লেজের মাথায় থাকত গিঁট। চাবুক মারার সময় এই গিঁটগুলো একসঙ্গে পিঠে আঘাত করত এবং ত্বক চিরে সমান্তরাল দাগ তৈরি করত। দেখতে যেন কোনো বন্য বিড়ালের নখের গভীর আঁচড়।
সমুদ্রযুগে এই চাবুক সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হতো জাহাজে, বিশেষ করে British Royal Navy-তে। তখন দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা ছিল কঠিন, আর শৃঙ্খলা বজায় রাখতে শাস্তিও ছিল কঠোর। জাহাজের ক্যাপ্টেনরা অবাধ্য নাবিকদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রায়ই এই চাবুক ব্যবহার করতেন। সমুদ্রের লবণাক্ত বাতাসে দড়ি শক্ত হয়ে না যায়, সে জন্য চাবুকটি সাধারণত একটি মোটা বস্তার ভেতর সংরক্ষণ করা হতো। অনেকের ধারণা, “let the cat out of the bag” প্রবাদটির উৎপত্তি এখান থেকেই।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শাসকদের ক্ষমতা যেমন বেড়েছে, তেমনি এই শাস্তির নির্মমতাও বেড়েছে। বিশেষ করে ব্রিটিশরা যখন বন্দিদের অস্ট্রেলিয়ার উপনিবেশগুলোতে পাঠাতে শুরু করে, তখন সেখানে ব্যবহৃত চাবুক আরও ভারী করে বানানো হতো। আঘাতকে আরও গভীর ও যন্ত্রণাদায়ক করতে কখনও দড়ির ভেতর তার জড়ানো হতো, কখনও মাথায় ধাতব টুকরো লাগানো থাকত। সাধারণ ক্যাট ও নাইন টেইলস যেখানে গভীর ক্ষত তৈরি করত, এই সংস্করণ পিঠের চামড়া পর্যন্ত ছিঁড়ে ফেলতে পারত।

জঁ-বাতিস্ত দ্যব্রে রচিত ‘চাবুকের শাস্তি কার্যকরকরণ © wikipedia
শাস্তির মাত্রা নির্ভর করত অপরাধের ওপর। সামান্য অবাধ্যতার জন্য ১২ ঘা ছিল সাধারণ শাস্তি। কিন্তু গুরুতর অপরাধে শাস্তির পরিমাণ অনেক বেড়ে যেত। কখনও শতাধিক ঘা মারা হতো। আঘাত এতটাই তীব্র ছিল যে অনেকেই ব্যথায় কথা বলতে পারত না। এখান থেকেই “Has the cat got your tongue?” প্রবাদটির উৎপত্তি হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।
বর্বরতার শেষ এখানেই নয়। একজন ব্যক্তির পক্ষে একই শক্তিতে বারবার চাবুক মারা সহজ ছিল না। তাই অনেক সময় একাধিক নাবিক পালা করে আঘাত করত, যাতে শাস্তির তীব্রতা কমে না যায়। উদ্দেশ্য ছিল শাস্তি যেন সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হয়।
সবচেয়ে ভয়ংকর দিক ছিল ধাপে ধাপে শাস্তি দেওয়ার প্রথা। কাউকে এমনভাবে মারা হতো, যতটা তার শরীর সহ্য করতে পারে। তারপর তাকে সেলে নিয়ে গিয়ে ক্ষত শুকাতে দেওয়া হতো। কয়েক সপ্তাহ পর আবার ডেকে এনে নতুন করে চাবুক মারা হতো। এভাবে চলতে থাকত, যতক্ষণ না শরীর আর সহ্য করতে পারত।

প্রায় ¼ ইঞ্চি পুরু, ন’টি অংশ (প্রায় ৪৬ সেন্টিমিটার বা ১৮ ইঞ্চি) লম্বা তারপোলা-মোড়ানো বোনা শণদড়ি দিয়ে তৈরি, যার প্রান্তগুলো বাঁধা। © wikipedia
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে এই শাস্তিকে অমানবিক বলা শুরু হয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে ধীরে ধীরে এর ব্যবহার কমে আসে। ১৮৮১ সালে ব্রিটিশ নৌবাহিনীতে ফ্লগিং কার্যত বন্ধ হয়ে যায়, যদিও ব্রিটেন ও অস্ট্রেলিয়ার কিছু কারাগারে বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত সীমিতভাবে এর ব্যবহার ছিল। আজও বিশ্বের কিছু অঞ্চলে চাবুক দিয়ে প্রকাশ্যে শাস্তি দেওয়ার নজির দেখা যায়, যদিও তা ভিন্ন আইনি কাঠামোর অধীনে।
ক্যাট ও নাইন টেইলস এক সময়ের প্রতীক, যখন শৃঙ্খলা মানেই ছিল ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা। ইতিহাসের এই অধ্যায় আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, ক্ষমতা যখন মানবিকতা হারায়, তখন শাস্তি খুব সহজেই নিষ্ঠুরতায় পরিণত হয়।

একজন নাবিককে ‘ক্যাট-ও’-নাইন-টেইলস’ দিয়ে চাবুক মারা হচ্ছে, আর চারজন নাবিক শাস্তি কার্যকর করার জন্য তাদের পালার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। © wikipedia

