ঘোড়ার ইতিহাস – মানবজাতির এক নীরব সহচর, Stay Curioussis

সভ্যতার সমৃদ্ধির পেছনে মানবজাতির অপরিসীম মেধা আর শ্রম পৃথিবীর ইতিহাসে চিরঞ্জীব থাকবে। সেই আদিম যুগ হয়ে নানা ঝড় ঝঞ্জাট পেরিয়ে আধুনিক এক সমৃদ্ধ সভ্যতার ভিত্তি গড়ে তুলা হয়েছে। সভ্যতা বিনির্মানে লেখা হয়েছে অনেক ত্যাগের ইতিহাস। কিংবদন্তির গল্পের মত হারিয়ে গেছে ইতিহাসের অনেক মহানায়ক। মানবজাতির এই নিদারুণ প্রচেষ্টার পেছনে শুধু এই প্রজাতির গর্ব আর উন্নাসিকতার আড়ালে চাপা পড়ে আছে আমাদের অনেক সহযাত্রীর স্বার্থহীন শ্রমে গড়া অবদান। উচ্চাকাঙ্খী বিজেতার ক্ষিপ্রগতির সহযাত্রী, দূরত্বকে খেলো বানিয়ে দেয়ার কীর্তিতে নীরব প্রোটাগনিস্ট আর মানবজাতির আনন্দের সহযোগী হয়ে থাকা চতুষ্পদ প্রাণী ঘোড়ার ইতিহাস মানবজাতিরই ইতিহাস। বন থেকে তুলে আনা এই প্রাণীকে পোষ মানিয়ে মানুষ এই প্রাণী দিয়েই শুরু করেছিল বিশ্বজয়। তারপর তার খুরের আঘাতে ধূলিঝড় উড়িয়ে পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে ঘোড়া জানান দিয়েছিল তার সদয় অস্তিত্ব। আধুনিক এই সময়ে এসে আমরা ভুলেই গিয়েছি এই প্রাণীর কাছে ঠিক কতটুকু ঋণের জালে আটক হয়ে আছি।

ঘোড়ার উৎপত্তির সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল উত্তর আমেরিকায় ৫৫ মিলিয়ন বছর আগে। আজকের ঘোড়ার যে আকার তখনকার ঘোড়া ঠিক এমন ছিল না। প্রথমদিককার ঘোড়ার আকার ছিল বড়জোর কুকুরের মত। বনই ছিল তাদের বাসস্থান। মিলিয়ন বছর ধরে পরিবেশের পরিবর্তনের ফলে ঘোড়ার বিবর্তন ঘটতে থাকে। জঙ্গল ছাড়িয়ে ঘোড়া সবুজ ঘাস সমৃদ্ধ মাঠকে বেছে নেয়। উত্তর আমেরিকা থেকে এই ঘোড়া ছড়িয়ে পড়ে এশিয়া, ইউরোপজুড়ে। প্রায় ১০ হাজার বছর আগে উত্তর আমেরিকান ঘোড়ার বিলুপ্তি ঘটে। ধারণা করা হয় জলবায়ূ পরিবর্তনের কারণে স্তন্যপায়ী প্রাণীর গণবিলুপ্তির আওতায় এই প্রজাতির ঘোড়াও এর শিকার হয়। তবে এর আগেই ঘোড়ার স্থানান্তর ঘটলে উত্তর আমেরিকান প্রজাতির ঘোড়ার বিলুপ্তি ঘটলেও বিবর্তিত ঘোড়া টিকে যায়।

IBxzpHZ4KKO1LZiG Ech, Stay Curioussis

প্রাচীনকালে গুহার দেয়ালে আঁকা ঘোড়ার রথ টানার দৃশ্য; Image Source: Early Church History

আধুনিক ঘোড়ার গৃহপালিত রূপ ঠিক কবে শুরু হয়েছিল এমন প্রশ্নের উত্তর নিয়ে এক বছর আগেও ছিল ধোঁয়াশা। তবে অক্টোবর ২০২১ সালে ১৬২ জন বিজ্ঞানীর গবেষণায় পাওয়া গেছে ঘোড়ার ডমেস্টিকেশনের প্রকৃত ইতিহাস। আধুনিক ঘোড়ার ডমেস্টিকেশন শুরু হয়েছিল আজ থেকে ৬ হাজার বছর আগে পশ্চিম ইউরেশিয়ার তৃণভূমি অঞ্চলে অর্থাৎ কৃষ্ণ সাগরের উত্তরে ইউক্রেন থেকে কাজাখস্তান পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে৷ ঘোড়াকে যখন গৃহপালিত পশু হিসেবে রূপ দেয়া হয় তখন এর উদ্দেশ্য ছিল ঘোড়ার মাংস ও দুধ এবং কৃষিকাজে সাহায্য লাভ করা। কিন্তু পরে দেখা গেল ঘোড়াকে বোঝা বহনের কাজেও ব্যবহার করা যাচ্ছে। একটি প্রাণীর এত উপযোগিতা যেকোন সমাজের জন্যই বেশ উপকারী। ফলে ঘোড়ার ডমেস্টিকেশন যে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা টের পাওয়া যায়৷ উত্তর আমেরিকা থেকে ঘোড়ার আদি ইতিহাস শুরু হলেও মূলত  ইউরেশিয়ান স্তেপ এবং আরো পরে ইউরোপীয়রা ঘোড়াকে একটি গৃহপালিত প্রাণী হিসেবে আরো বেশি অনুগত ও কর্মক্ষম করে তুলে। চতুর্দশ শতাব্দীর শেষ নাগাদ স্প্যানিশ ও ইউরোপীয় কনকুইস্ট্যাডরদের (বিজেতা) মাধ্যমে ঘোড়ার ব্যাপক পরিচয় ঘটে। ১৭০০ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ঘোড়ার অস্তিত্ব ছিল চোখে পড়ার মতো। বিজ্ঞানীদের হিসাবমতে, সেসময় যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২ মিলিয়ন ঘোড়া ছিল।

প্রাচীন ও মধ্যযুগে সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছিল ঘোড়া। যুদ্ধক্ষেত্রে অশ্বারোহী বাহিনীর শক্তিমত্তার উপরেই যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নির্ভর করতো। যুদ্ধে ঘোড়ার প্রথম ব্যবহার পাওয়া যায় ইউরেশিয়ায় খ্রিস্টপূর্ব ৪ হাজার থেকে ৩ হাজার সময়ে। ১৬০০ খ্রিস্টপূর্বের মধ্যে প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্য ও মেসোপোটেমিয়া অঞ্চলে ঘোড়ার যুদ্ধরথের ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। যুদ্ধের প্রকৃতি অনুসারে বিভিন্ন আকৃতির ঘোড়া ব্যবহার করা হতো। যুদ্ধ সরঞ্জাম বহন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষিপ্র গতির জন্য ঘোড়াকে ব্যবহার করা হতো। মধ্য এশিয়ার স্তেপ অঞ্চলের যাযাবর যুদ্ধ স্টাইলে ঘোড়ার ব্যবহার ছিল সবচেয়ে বেশি ফলপ্রসূ। সপ্তম ও অষ্টম শতকে মুসলমানদের বিভিন্ন অভিযানে লাইট ক্যাভালরির ওপর তারা সবচেয়ে বেশি নির্ভর করতো। আর এই লাইট ক্যাভালরির প্রধান চরিত্র ছিল ঘোড়া। মধ্যযুগের ইউরোপে বিভিন্ন ধরনের ঘোড়া যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা হতো। এর মধ্যে নাইটদের ঘোড়া ছিল সবচেয়ে বেশি দক্ষ। কম ওজনের প্রাচ্যদেশীয় ঘোড়া ব্যবহার হতো ক্ষিপ্রগতি এবং দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে। এই ঘোড়াগুলোর আদিরূপ পাওয়া গিয়েছিল মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে। ৮০০ থেকে ১০০০ পাউন্ড ওজনের ঘোড়াগুলো থেকে অশ্বারোহী সৈন্যের দ্রুতগতিতে অস্ত্র সংগ্রহের কাজ সহজ হয়ে যেত। স্কাইথিয়ান (আধুনিক ইউক্রেন ও দক্ষিণ রাশিয়ার যাযাবর জাতি), পার্থিয়ান (উত্তর-পূর্ব ইরানের বাসিন্দ), মোঙ্গল, আরব, প্রাচীন মিশরীয় ও আমেরিকান ইন্ডিয়ানরা কম ওজনের ঘোড়া সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করতো। Ancient near east (আধুনিক মধ্যপ্রাচ্য) জুড়ে ঘোড়ার প্রাথমিক সময়ে আকৃতি ছোট হওয়ার কারণে ঘোড়ার যুদ্ধরথের জন্য দুই বা তার অধিক ঘোড়া ব্যবহার করা হতো। মাঝারি ওজনের ঘোড়ার ব্যবহার শুরু হয়েছিল ভারী জিনিসপত্র বহন এবং বিশালদেহী অশ্বারোহী সৈন্যের বহনের কাজে। মাঝারি ওজনের ঘোড়ার ব্যবহার বাড়তে থাকলে এবার প্রয়োজন দেখা দেয় ভারী ওজনের ঘোড়ার। দেড় হাজার থেকে দুই হাজার পাউন্ড ওজন বিশিষ্ট এই ঘোড়াগুলো মধ্যযুগের ইউরোপে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ছিল। অতিকায় ওজনের নাইটদের বহনেও এই ঘোড়ার ব্যবহার ছিল চোখে পড়ার মতো।

Blog FI 08.27.14 A History Of Horse Breeds02, Stay Curioussis

ঘোড়ার বিবর্তন। Image: Equine Facility Design

প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে মধ্য এশিয়ার অশ্বারোহী  যাযাবর শ্রেণীর উল্লেখ পাওয়া যায়৷ মধ্য এশিয়ায় যুদ্ধে ঘোড়ার ব্যবহার সম্পর্কে সবচেয়ে প্রাচীন তথ্য পাওয়া যায় হিন্দু পুরাণে। এই বর্ণনামতে, সাকাস, কামবোজাস, ইয়াভানাস, পাহলাভাস, পারাদাস অঞ্চলের যৌথ অশ্বারোহী বাহিনী ১৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে অযোধ্যা আক্রমণ করে সেখানকার বৈদিক রাজা বাসুকে সিংহাসনচ্যুত করে। পরবর্তী সাহিত্য মহাভারতে বলা হয়েছে, এরপর থেকে ভারতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যুদ্ধ ঘোড়া তৈরি করা হয়। এরমধ্যে সিন্ধু ও কামবোজার ঘোড়া ছিল উন্নত প্রজাতির। মহাভারতে আরো উল্লেখ করা হয় কামবোজা, গন্ধরস, ইয়াভানাসের ঘোড়া যুদ্ধতে ছিল বেশি পারদর্শী।

সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীতে মুসলিম যোদ্ধারা উত্তর আফ্রিকা ও আইবেরিয়ান পেনিনসুলা দখল করে। ৬২২ এ নবী মোহাম্মদের হিজরতের পর ইসলামের দ্রুত প্রসার ঘটে। ৭১১ সালের মধ্যে মুসলিম লাইট ক্যাভালরি দল ইউরোপের স্পেন পর্যন্ত পৌছে যায় এবং ৭২০ সালের মধ্যে আইবেরিয়ান পেনিনসুলার  (স্পেন ও পর্তুগাল) বেশিরভাগ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেয়। আর তাদের এই অভিযানের পেছনে ছায়ার মতো ছিল উত্তর আফ্রিকার বার্ব ও আরব উপদ্বীপের ঘোড়া। স্পেন থেকে ফ্রান্সে গিয়ে মুসলিম বাহিনী থমকে যায়। ৭৩২ সালে টুরসের যুদ্ধে চার্লস মার্টেলের বাহিনীর কাছে তারা পরাজিত হয়। যুদ্ধের পর মুসলমানদের কাছ থেকে আরব ও অন্যান্য প্রাচ্যদেশীয় ঘোড়া জব্দ করা হয়। স্থানীয় ঘোড় ও জব্দকৃত ঘোড়া দিয়ে তৈরি করা হয় ঘোড়ার নতুন আরেক জাত।

Bhagavan Kalki, Stay Curioussis

হিন্দু পুরাণে ঘোড়া, Image: Wikimedia

মধ্যযুগের ইউরোপে প্রথমদিকে যুদ্ধে তিন ধরনের ঘোড়া ব্যবহার করা হতো। এগুলো ছিল The Destrier, the Courser এবং thethe Rouncey. Rouncey প্রজাতির এই ঘোড়া সাধারণ স্কয়ার (নাইটের অস্ত্র বহনকারী) এবং অশ্বারোহী সৈন্যের ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত ছিল। এই প্রজাতির ঘোড়া যুদ্ধ এবং সাধারণ ভার বহন দুই কাজেই উপযুক্ত ছিল। The Courser ছিল উচ্চ গতির, ক্ষিপ্র এবং বিধ্বংসী যুদ্ধের জন্য উপযুক্ত। The destrier ছিল সবচেয়ে বিখ্যাত। এই শ্রেণীর ঘোড়া অভিজাত নাইটদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। এই জাতের ঘোড়াকে কঠোর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যুদ্ধের জন্য উপযুক্ত করে তুলা হতো।

বাংলায় ঘোড়ার আগমন ঘটেছিল এর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে। ভারতে ঘোড়া আমদানির একটি ট্রানজিট পয়েন্ট হয়ে উঠেছিল বাংলা অঞ্চল। ভুবনবিখ্যাত সাম্রাজ্য মৌর্য সাম্রাজ্য তাদের নিজেদের জন্য ঘোড়া নিয়ে আসত মধ্য এশিয়া, আফগানিস্তান ও উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। এই ঘোড়াগুলো আবার প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় রফতানি করার জন্য
ব্যবহার করা হতো বাংলার বিভিন্ন বন্দর। অবশ্য এর আগ থেকেই তিব্বতি ঘোড়া আমদানি করা হতো বাংলায়। এই তিব্বতি ঘোড়া থেকে মোঘলদের তাংঘান জাতের ঘোড়ার উৎপত্তি ঘটেছিল। বাংলা ও বিহারের সীমান্তে প্রতিপালিত হতো এসব ঘোড়া। বাংলার পক্ষ থেকে অনেকসময় এই প্রজাতির ঘোড়া উপহার দেয়া হতো মোঘল সম্রাট শাহজাহানকে। সম্রাটের পুত্র বাংলার সুবাদার শাহ সুজা একবার একটি টাট্টুঘোড়াও উপহার দিয়েছিলেন শাহজাহানকে।

TLu0n3AvbVyypIUa Kinooze, Stay Curioussis

আলেকজান্ডার ও বুসেফেলাস; Image Source: Wikipedia

পৃথিবীর সাম্রাজ্যবাদী ইতিহাসে ঘোড়া একটি কিংবদন্তিতুল্য চরিত্র। এই প্রাণীর ঘাম আর শ্রমে মানুষ জয় করেছে একের পর এক দেশ। বাড়িয়েছে নিজের সাম্রাজ্যের সীমা, হয়ে উঠেছে খ্যাতিমান। পূর্ব থেকে পশ্চিম, আটলান্টিক থেকে হিমালয় জুড়ে ঘোড়ার ক্ষুরের আঘাতে রচিত হয়েছিল পৃথিবীর রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাস। তাই ঘোড়ার ইতিহাস যে মানুষেরই ইতিহাস সে কথা বললে খুব বেশি অত্যুক্তি হবার কথা নয়।

 
তথ্যসূত্র