ক্রীতদাস প্রথার অভিশাপ প্রাচীন ও মধ্যযুগের পৃথিবীর বিভিন্ন সাম্রাজ্যে বলবৎ ছিল। সেই সুমেরীয় সভ্যতা থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের আমেরিকা পর্যন্ত ক্রীতদাসদের ব্যবহার করেছে নিজ অর্থনৈতিক স্বার্থে। এইসব দাস বহুলাংশে আফ্রিকা মহাদেশ থেকে আগত ছিল। প্রকৃতপক্ষে জোর করেই এদের নিয়ে আসা হতো। ভারতীয় উপমহাদেশে অনেক ক্রীতদাস নিজেদের দক্ষতায় সাম্রাজ্যের সম্রাট পর্যন্তও হয়েছেন। তবে সব ক্রীতদাসের ভাগ্যে এমন সুযোগ জুটেনি। দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তির জন্য অনেকে বিদ্রোহ করেছে। কেউ সফল হলেও বেশিরভাগই হয়েছে ব্যর্থ। এমনই এক ব্যর্থ আপাত সফল বিদ্রোহ ছিল জাঞ্জ ক্রীতদাস বিদ্রোহ। ইসলামি সাম্রাজ্য আব্বাসীয় খিলাফতের বিরুদ্ধে জাঞ্জ ক্রীতদাসরা দীর্ঘ সময়ব্যাপী ইরাকে এক বিপ্লব জারি রেখেছিল।

আরবি শব্দ জাঞ্জ দিয়ে বুঝানো হতো পূর্ব আফ্রিকা থেকে আগত ক্রীতদাসদের। আফ্রিকান ক্রীতদাসরা উত্তর আমেরিকা আসার অনেক আগেই মধ্যপ্রাচ্যে থাকা এই ক্রীতদাসরা শক্তিশালী আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। ইরাকের বসরার ভূমি মালিকরা পূর্ব আফ্রিকার সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চল থেকে বান্টু ভাষী এসব দাসের আমদানি করেছিল সাতিল আরবের  লবণ চাষ বিস্তৃত করার জন্য। অষ্টম শতক থেকে তেরো শতক পর্যন্ত আরবের মুসলমানরা কৃষিকাজে এক ধরনের বিপ্লব নিয়ে আসে। ফলে এই খাতে প্রচুর শ্রমিকের  প্রয়োজন দেখা দেয়। কৃষি আরবের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলেও এই কাজকে সাধারণ আরবরা নিচু শ্রেণির কাজ বলে মনে করতো। ফলে স্থানীয় শ্রমিকরা এই কাজে অংশ নিতো না। তাই কৃষি খামারের মালিকরা আফ্রিকা থেকে দাস ক্র‍য় করে নিয়ে আসতেন।

জাঞ্জ বিদ্রোহ হয়েছে ছিলো দাসদের নিয়ে আর এইখানে আরব দেশের কিছু দাসে দেখানো হয়েছে

১৩ শতকের পাণ্ডুলিপির একটি দৃশ্য, যেখানে আরব বিশ্বের ক্রীতদাসদের দেখানো হয়েছে।

ক্রমাগত বন্যায় তাইগ্রিস ও ইউফ্রেতিস নদীর উর্বর অঞ্চল পানিতে ডুবে শস্য উৎপাদনের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ভূস্বামীরা এই ভূমিকে আবার উৎপাদনশীল করার জন্য সরকারিভাবে বিশাল অঞ্চলের বরাদ্দ নেয়। ইরাকের খুজেস্তানে ইক্ষু উৎপাদনের জন্যও শ্রমিকের প্রয়োজন ছিল। এই কাজগুলো ছিল কঠোর পরিশ্রমের। আর শ্রমিক হিসেবে ছিল সেই জাঞ্জ ক্রীতদাসরা।
কঠোর পরিশ্রম করলেও তাদের কোন মজুরি দেয়া হতো না। শুধুমাত্র অল্প খাবারের বিনিময়ে তাদের দিয়ে এই কাজ করানো হতো। তাদের মালিকের সাথে তাদের সরাসরি কোন যোগাযোগ ছিল না। আলাদা এক তত্ত্বাবধায়ক তাদের দেখভাল করতো। এরা ছিল নিষ্ঠুর প্রকৃতির। ফলে তাদের ভেতরে ক্রোধ বাড়তে থাকে। তারা যেন একটি উপলক্ষ খুঁজে বেড়াচ্ছিল বিদ্রোহের। আর সেটির প্রেক্ষাপট তৈরিও হয়ে যায়।

বিদ্রোহ শুরু

৮৬৯ সালে আব্বাসী খিলাফত চলাকালীন আলী বিন মোহাম্মদ নামের এক আরব বিপ্লবী নেতা জাঞ্জ ক্রীতদাসের মুক্তি ও তাদেরকে জমি দেয়ার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। আলী বিন মোহাম্মদের পূর্বপুরুষ ছিলেন ক্রীতদাস এবং তিনি নিজে বেড়ে উঠেছিলেন তাইগ্রিস নদীর তীরে সামারা অঞ্চলে। তিনি একসময় বাগদাদে আসেন এবং আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের প্রভাবশালী কয়েকজন ক্রীতদাসের সাথে পরিচিত হন। খলিফা ও সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে জীবনযাত্রার পার্থক্য অবলোকন করে তার মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তিনি অতঃপর বাহরাইনে চলে যান এবং সেখানে তিনি নিজেকে শিয়া অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে বাহরাইনের শিয়াদের আব্বাসীদের বিরুদ্ধে উজ্জীবিত করেন। বাহরাইনে বিদ্রোহের চেষ্টা করলে তিনি ব্যর্থ হন। ৮৬৮ সালে তিনি বসরাতে পালিয়ে যান। সেখানেই তিনি জাঞ্জ ক্রীতদাসের সাথে আরো ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ পান। তার উদ্দেশ্য ছিল মূলত আব্বাসী শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। আর এ কাজে তিনি জাঞ্জ ক্রীতদাসের সেন্টিমেন্ট কাজে লাগিয়ে তাদের দলে ভিড়াতে সক্ষম হন। তিনি জাঞ্জদের জীবনযাপন ও খাবারের মানের ওপর তদন্ত করা শুরু করেন।
খারিজী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি এ ঘোষণা দেন যে,যোগ্যতা থাকলে এই ক্রীতদাসরা সাম্রাজ্যের খলিফাও হতে পারবে। তিনি জাঞ্জদের উদ্দেশ্য করে বলেন স্বয়ং আল্লাহ তাকে পাঠিয়েছেন তাদেরকে মুক্ত করার জন্য। তার এই মতবাদ জাঞ্জ ক্রীতদাসের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। তিনি নিজে সাহিব আজ জাঞ্জ বা জাঞ্জদের বন্ধু উপাধি গ্রহণ করেন। তবে সাম্রাজ্যের বেদুইন ও কৃষক সমাজের কাছেও তিনি ছিলেন ব্যাপক জনপ্রিয়। আলী বিন মোহাম্মদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রায় ৫ হাজার জাঞ্জ ক্রীতদাস তার সাথে যোগ দেয় যাদের উদ্দেশ্য ছিল আব্বাসী শাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ। বিদ্রোহীরা প্রথমে গেরিলা পদ্ধতিতে তাদের  বিদ্রোহ শুরু করে। রাতে  অস্ত্র সজ্জিত হয়ে সুযোগ বুঝে আব্বাসী বাহিনীর উপর আক্রমণ করে তাদের অস্ত্র, গোলাবারুদ, ঘোড়া ও খাবারদাবার লুট করে নিয়ে আসতো। তাদের এই গেরিলা আক্রমণে বেশ বিপাকে পড়ে যায় আব্বাসীয় সেনাবাহিনী। জাঞ্জ বিদ্রোহীরা শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা অবরোধ করে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দিতো৷ তারা অনেক জাঞ্জ ক্রীতদাসকে মুক্তও করে নিয়ে আসতো। খুব দ্রুতই প্রকৌশল কাজে দক্ষ হয়ে উঠে তারা। প্রতিরক্ষার জন্য দুর্গ নির্মাণের পাশাপাশি নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থারও প্রভূত উন্নতি সাধন করে তারা। জাঞ্জরা একসময় নিজস্ব নৌবাহিনীও গঠন করে। ফলে আব্বাসীয় সামরিক বাহিনী কঠোর প্রতিরোধের মুখে পড়ে।

জাঞ্জ বিদ্রোহের সময় ইরাক

জাঞ্জ বিদ্রোহের সময় ইরাক এবং আল-আহওয়াজের মানচিত্র

৮৭১ সালে বসরা শহর নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় জাঞ্জ বিদ্রোহীরা। এই বিদ্রোহ ধীরে ধীরে একটি বিপ্লবে রূপ নিতে থাকে। তারা পুরো দক্ষিণ ইরাক ও মধ্য ইরাকের কয়েকটি শহর দখলে নিয়ে নিজেদের পৃথক মুদ্রা চালু করে। অবশেষে আব্বাসীয় বাহিনী এদের সমূলে উৎপাটন করার সিদ্ধান্ত নেয়। আল মুয়াক্কাফের নেতৃত্বে এক বিশাল সৈন্যবাহিনী এগিয়ে যায় আলী বিন মোহাম্মদের বাহিনীকে পদানত করতে। আব্বাসীয় বাহিনীর কাছে দুর্বল হতে থাকে তারা। তবে জাঞ্জরা রাত্রিকালীন গেরিলা যুদ্ধ অব্যাহত রাখে। আল মুয়াফফাকের বাহিনী বাহরাইনের গেরিলা নেতা ইয়াহিয়াকে ধরে নিয়ে গিয়ে তার দুই হাত ও পা কেটে তার মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এই ঘটনায় বিদ্রোহীদের মনোবল দুর্বল হলেও তারা তাদের সশস্ত্র বিদ্রোহ অব্যাহত রাখে। এর মধ্যে ইরাক পারস্যের সাফাভীদ সেনাবাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হলে এই সুযোগ কাজে লাগায় জাঞ্জরা। স্থানীয় বেদুইনদের সহযোগিতায় উত্তরাঞ্চলে তাদের দখল আরো বিস্তৃত করে। এ সময় তারা নিজেদের রাজধানীও স্থাপন করে। যার নাম ছিল আল মুখতারা। ৮৭২ সালে জাঞ্জদের দমন করতে আরেকটি বিশাল বাহিনী প্রেরণ করা হয় তাদের নবগঠিত রাজধানী আল মুখতারায়। কিন্তু তাদের গেরিলা আক্রমণে স্বয়ং আব্বাসীয় সেনাপতিই নিহত হন। বাকি সেনাদের সবাইকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। মুক্ত বিদ্রোহী ক্রীতদাসরা অনেকেই তাদের পুরনো মনিবদের হত্যা করে।  আবার কেউ বিদ্রোহে আর্থিক সাহায্য দিয়ে মুক্তি পায়। ৮৭৯ সালের দিকে আব্বাসীরা এই বিদ্রোহ দমনে ভিন্ন এক পদ্ধতির আশ্রয় নেয়। তারা বিদ্রোহী সেনাদের অর্থ দিয়ে যুদ্ধ ত্যাগের প্রস্তাব দেয় এবং অনেক বিদ্রোহী ক্রীতদাসকে সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পদেও আসীন করা হয়। এভাবে তাদের দুর্বল করা হয়।  ৮৮১ সালে আব্বাসীয় সেনাবাহিনী জাঞ্জদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আক্রমণে নামে। রাজধানীর মুখতারা ঘেরাও করা হয়। জাঞ্জদের নেতা আলী বিন মোহাম্মদকে গ্রেফতার ও পরে হত্যা করা হয়। পতন হয় জাঞ্জ রাজধানী মুখতারার। যুদ্ধ শেষে বাকি বিদ্রোহীদের আব্বাসী সেনাবাহিনীতে আত্মীকরণ করা হয়। কিছু বিদ্রোহী মরুভূমি পাড়ি দিয়ে ইরাকি সীমানা অতিক্রম করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পানির অভাবে ক্লান্ত হয়ে বেশিরভাগই মৃত্যুর মুখে পতিত হয়। যারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল তাদের অনেকেই ডাকাতি ও খুনের মত পেশায় জড়িয়ে পড়ে এবং সুযোগ বুঝে আব্বাসী সেনাবাহিনীকে আক্রমণ করা শুরু করে। এভাবে ১৫ বছর আব্বাসী বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত রেখে এই আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটে। প্রকৃত অর্থে এটি ক্রীতদাস বিদ্রোহ হলেও এই বিদ্রোহে স্থানীয় বেদুইন, ভূমিদাস, শ্বেতাঙ্গ ও অনেক ভারতীয়রাও অংশ নিয়েছিল। তাই এটি শুধুমাত্র জাঞ্জ বা ক্রীতদাস বিদ্রোহ ছিল এমনটিও বলা যাবে না। শোষক ও অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে প্রান্তিক শ্রেণির একটি বিপ্লব হিসেবে এই বিদ্রোহকে ব্যাখ্যা করা যায়।

তথ্যসূত্র