মদের ইতিহাস খুবই চমকপ্রদ ও বৈচিত্র্যময়, এবং এর যাত্রাপথও ছিল অনেকটা দীর্ঘ। এটি শুধু এক ধরনের পানীয় নয়, একটি সংস্কৃতির প্রতীক। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ ধর্মীয় রীতিনীতি, রাজকীয় ভোজ এবং দৈনন্দিন জীবনে এটিকে ব্যবহার করে আসছে। আজ মদের উৎপাদন ও ব্যবহার পৃথিবীর প্রায় সব মহাদেশেই কমবেশি দেখা যায়।
অনেকের ধারণা, মদের জন্ম হয়েছে ইউরোপে। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিকরা বলেন, প্রায় ৯০০০ খ্রিস্টপূর্বে চীনে প্রথমবারের মতো মদ বানানো হয়। তবে তাদের প্রক্রিয়াটা ছিল কিছুটা আলাদা। আঙ্গুর, চাল ও মধু দিয়ে তৈরি করা হতো এই মদ। তারও ২০০০ বছর পর ইরানে এবং আর্মেনিয়া ও জর্জিয়ার দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলে আঙ্গুর চাষ শুরু করা হয়। ২০১৬ সালে আর্মেনিয়ায় বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো ওয়াইন কারখানা খুঁজে পাওয়া যায়। সেখানে পানপাত্র, আঙ্গুর পিষ্ট করে রস বের করার যন্ত্র এবং মদ সংরক্ষণের পাত্রসহ অনেক কিছু ছিল। এই মদ সম্ভবত আজকের মেরলো রেড ওয়াইনের মতো। এগুলো ধর্মীয় কাজেও ব্যবহার করা হতো।

ইটের রিলিফে মদ তৈরির দৃশ্য, খ্রিষ্টপূর্ব ২৫–২২০ সাল © Wikimedia
মদের লিখিত ইতিহাসের হদিস মেলে মিশরে—খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে। তবে মিশরে বিয়ার ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয় এক পানীয়। আর শুধুমাত্র ধনীদের ও ফারাওদের পানীয় ছিল এই মদ। শুষ্ক আবহাওয়া, জলবায়ু ও ভূমির কারণে মিশরে আঙ্গুর চাষ সহজ ছিল না। এছাড়া মদের রঙ ছিল লাল। এর ফলে মিশরীয়রা পুনর্জন্মের দেবতা ওসিরিসের রক্ত বলে ভাবত এই মদকে। আর এই কারণেই এটি শুধু তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও চিকিৎসায় ব্যবহার করা হতো। ফিনিশীয়রা মিশরীয়দের আঙ্গুর ও মদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। সেটা ইহুদিদের কাছেও ছড়িয়ে পড়ে। বাইবেলে নোহকে একজন মদ প্রস্তুতকারক হিসেবেই বর্ণনা করা হয়।
গ্রিকরাও এতে পিছিয়ে থাকেনি। তারা এই মদকে গণমানুষের পানীয় বলে উপস্থাপন করেন। আর পথের ব্যবসায়ী ফিনিশীয়দের হাত ধরে মদ ভূমধ্যসাগরে ছড়িয়ে পড়ে। প্রাচীন গ্রিস এই মদকে সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। এটি তখন আর শুধুমাত্র দেবতা এবং উচ্চবর্ণের মানুষের জন্য সংরক্ষিত থাকেনি। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০–২০০০ সালের মধ্যে ক্রিট দ্বীপের মিনোয়ান কবরস্থানগুলোতে মদের অস্তিত্বের প্রমাণ মেলে। বলা যায়, গ্রিকরা মদ তৈরি প্রক্রিয়াকে এক পরিপূর্ণ রূপ দেয়।
গ্রিসের রাজা থেকে তাদের ক্রীতদাস পর্যন্ত সবাই মদ পান করতো। তবে সমাজের ধনী-গরিবের মধ্যে মদের স্বাদের এবং মানের কিছুটা তফাৎ ছিল। বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা করার সময় গ্রিক দার্শনিকরা “সিম্পোসিয়ামে” এক বিশেষ মদ পান করতেন। তবে তারা কখনো এটি সরাসরি পান করতেন না—পানির সঙ্গে মিশিয়ে খেতেন। মাতাল হওয়া ছিল তাদের কাছে বর্বর আচরণ।
উদ্ভিদ, ফসল, উর্বরতা, উন্মাদনা ও মদের দেবতা ছিলেন ডায়নোসিস। রোমানরা তাকে ব্যাক্কাস বলে ডাকতেন, এবং তাকে সম্মান জানাতে নানা রকম উৎসবের আয়োজন করতো গ্রিকরা। আর সেই উৎসবে সমাজের মানুষ বিধিবদ্ধ নিয়ম ভেঙে মুক্ত হয়ে আনন্দ-ফুর্তি করতো—নাচ, গান, এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে উশৃঙ্খল আচরণেও মেতে উঠতো। এসব উৎসবে নারী, ক্রীতদাস এমনকি বন্দীরাও অংশগ্রহণের সুযোগ পেতো।

প্রাচীন মিশরের মদ তৈরির দৃশ্য © Wikimedia
সময়ের আবর্তে যখন রোমানরা শক্তিশালী হয়ে উঠতে শুরু করে, তখন এই মদের সংস্কৃতিকে তারা ও নিজেদের সংস্কৃতির অংশ বানিয়ে ফেলে। তারা কাঠের পিপে, নতুন ধরনের সংরক্ষণ পদ্ধতি উদ্ভাবনের মাধ্যমে মদের মানও বাড়াতে চেষ্টা করে এবং মদকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করে তোলে।
মজার বিষয়, রোমান সাম্রাজ্যের সৈন্যদের কাজই ছিল যুদ্ধের জন্য এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়া। সে সময়ে তারা সঙ্গে নিয়ে যেত আঙ্গুর গাছ। এভাবেই ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে আঙ্গুরের চাষ শুরু হয়। বিশেষ করে বর্তমান ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, ইতালি, বলকান—এই দেশগুলোতে আঙ্গুরের চাষ হয়তো রোমান সৈন্যদের দ্বারাই শুরু হয়েছিল। সৈন্যদের আমোদ-প্রমোদ ও ভালো লাগা তৈরির জন্য দুর্গের পাশেই আঙ্গুরবাগান গড়ে উঠতো। পরবর্তী কালে সেই জায়গাগুলোতেই ইউরোপের বিখ্যাত মদ উৎপাদনকারখানাগুলো গড়ে ওঠে।
একটা পর্যায়ে রোমানরা খ্রিস্টধর্মকে নিজেদের ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করে। কনস্টান্টাইনের আইনে খ্রিস্টধর্মই রাষ্ট্রীয় ধর্ম হয়। দেখা যায়, বাইবেলের বিভিন্ন ঘটনায় মদ তৈরির অলৌকিক কাহিনি উঠে আসে। যিশু তার ভোজের অনুসারীদের পানীয় হিসেবে মদ উপহার দেন। সে কারণেই খ্রিস্টধর্মে মদের ব্যবহার গুরুত্ব পায়। খ্রিস্টান চার্চ, বিশেষ করে ক্যাথলিক ও অর্থোডক্স চার্চ—মদ সংরক্ষণ এবং তৈরিতে মনোযোগ দেয়। ইতালি ও ফ্রান্সের গির্জার ভিক্ষুরা, বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সন্ন্যাসীরা এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তবে কোরআনে মদ নিষিদ্ধ হওয়ায় ইসলামী বিশ্বে এর ব্যবহার কমে আসে।
আমেরিকায় প্রথম মদ উৎপাদন শুরু হয় দক্ষিণ আমেরিকায়। ভাইকিংদের বর্ণনায় ‘ভিনল্যান্ড’ নামে এক দেশে আঙ্গুরের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এই ভিনল্যান্ড অঞ্চল হচ্ছে আজকের উত্তর আমেরিকা। এখানে ইউরোপীয়দের স্থায়ী বসতি গড়তে আরও চার শতক লেগে যায়।
স্প্যানিশরা ১৫ শতকে দক্ষিণ আমেরিকায় তাদের উপনিবেশ গড়ে তোলে এবং সেখানে মদ তৈরির কাজ শুরু করে। মিশনারিরা এই অঞ্চলটিকে আর্জেন্টিনায় নিয়ে যায়। চিলি এবং আর্জেন্টিনা আজ বিশ্বের অন্যতম মদ উৎপাদক দেশ হিসেবে পরিচিত।
ফরাসি এবং স্প্যানিশরা প্রথম আঙ্গুর চাষ শুরু করে উত্তর আমেরিকায়। পরে ১৯ শতকে ক্যালিফোর্নিয়া অঞ্চলে মদ তৈরি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং আজও এটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় মদ উৎপাদন এলাকা।

টেরাকোটা ক্রেটার (মদ ও জল মিশানোর পাত্র), প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ সাল, মেট্রোপলিটান মিউজিয়াম অফ আর্টের মাধ্যমে। © Wikimedia
মদ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়লেও জাপানে এটা নিষিদ্ধ ছিল। ডাচরা দক্ষিণ আফ্রিকায় কলোনি গড়ে তুলে সেখানে আঙ্গুর চাষ শুরু করে, এবং নাবিকেরা দীর্ঘ যাত্রায় মদ পান করতো।
তবে জাপানের সঙ্গে মদের সম্পর্কটা একটু অন্যরকম। ১৬শ শতকে পর্তুগিজ মিশনারিরা খ্রিস্টধর্ম ও মদ—দু’টোই নিয়ে জাপানে আসে। কিন্তু ১৬০০ সালের দিকে জাপানের কঠোর সিদ্ধান্তে খ্রিস্টধর্ম এবং মদ দুটিই নিষিদ্ধ করা হয়। এর ফলে তারা বিদেশি প্রভাব কমাতে চায়। মেইজি পুনর্জাগরণের সময় জাপান আবার পশ্চিমা সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেদের একত্র করে এবং তখন মদ আবার ফিরে আসে।
ইতিহাস ঘুরে ফিরে আবার চীনে ফিরেছে মদের আধিপত্য। মদের যাত্রা শুরু হয়েছিল চীনে, আর এখন চীনই হয়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম বড় মদ উৎপাদক ও ভোক্তা। প্রাচীন চীনা চালের মদ এখনও জনপ্রিয়, তবে ইউরোপীয় ধাঁচের আঙ্গুরের মদেও তাদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
আজ মদ অ্যান্টার্কটিকাতেও ক্ষুদ্র মাত্রায় হলেও চাষ হচ্ছে। এমনকি অ্যাপোলো ১১ অভিযানে চাঁদেও মদ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সুতরাং মদ মানুষের মতোই কোনো সীমারেখা মানে না, এবং ভবিষ্যতে এর যাত্রা কোনদিকে যাবে, সেটাও নিছক কল্পনার বিষয়।

যিশু জলকে মদে রূপান্তর করছেন, ১৪শ শতকের মোজাইক, খোরা চার্চ, ইস্তানবুল © Wikimedia
হাজার হাজার বছর পার করে ধর্ম, রাজনীতি, যুদ্ধ, আনন্দ ও সংস্কৃতির সাক্ষী হয়ে আজও টিকে আছে মদ। এটি শুধু একটি পানীয় নয়—একটি ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার। আজ বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে এই পানীয়।

