ট্রয়ের এক সুবিশাল প্রাসাদে রাজা প্রিয়াম এবং
রাণী হেকিউবার ঘরে জন্ম নিল এক অসাধারণ রাজকুমার। তাদের প্রথম সন্তান হেক্টর। ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত দায়িত্ববান ছিল ছেলেটি। তার চোখ সর্বদা সতর্ক দৃষ্টি রাখতো তার পরিবার, তার শহরের মঙ্গলের জন্য। তার অন্তর ছিল সত্যিকারের রাজপুত্রের মতন। তার বাবা-মা ছোট বেলা থেকেই রাজকীয় শিক্ষার সাথে সাথে সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং সাহসিকতার দীক্ষা দিয়ে তাকে বড় করেছিল। ক্রমান্বয়ে একজন শক্তিশালী যোদ্ধা সাথে এক কৌশলবিদ হিসেবেও দিকে দিকে খ্যাতি পেলো এই রাজপুত্র ।
হেক্টরের জীবনের সবচেয়ে প্রিয় ছিল তার স্ত্রী অ্যান্ড্রোমাক এবং তার সন্তান অ্যাস্টিয়ানাক্স। অ্যান্ড্রোমাক ছিলেন কিলিকিয়ার এক ছোট রাজ্যের রাজকন্যা। তিনিও তার বাবার ঘরে সততা, সৌন্দর্য এবং শিষ্টাচারের জন্য সুপরিচিত ছিলেন। দুজনের মধ্যে সম্পর্কের বোঝাপড়া ছিল দারুণ। পরস্পর পরস্পরের প্রতি প্রেম ছিল স্বর্গীয়। অ্যাস্টিয়ানাক্স ছিল তাদের জীবনের আনন্দ, আর হেক্টরের প্রেমিকা। কিন্তু তাদের এই শান্তি বেশিদিন টেকেনি।

হেক্টর স্ত্রী অ্যান্ড্রোমাক এবং তার সন্তান অ্যাস্টিয়ানাক্স © alamy.com
হেক্টরের ছোট ভাই পারিস তাদের ট্রয়ের শান্ত জীবনকে তছনছ করে দেয়। পারিস স্পার্টার হেলেনকে অপহরণ করে নিয়ে আসে ট্রয়ে। হেলেন ছিল পৃথিবীর অন্যতম সুন্দরী নারী। ব্যাস এই সুন্দরী নারী এবং বিবাহিতা স্ত্রীকে অপহরণের দায়ে গ্রিকদের মধ্যে জ্বলে উঠলো প্রতিশোধের আগুন। হেলেনের স্বামী মেনেলাউস রাগে অন্ধ হয়ে তার বড় ভাই আগামেমেরনের সাহায্যে নিয়ে সমগ্র গ্রিক জোটকে এক করে রওনা দিল ট্রয়ের দিকে।
হেক্টর পারিসের এই কাজকে সমর্থন না করলেও কর্তব্যবোধ থেকে তিনি ট্রয় শহর এবং তার পরিবারকে রক্ষা করতে যুদ্ধে জড়িয়ে পরলেন। তিনি নেতৃত্ব দিলেন তার সৈন্যদের। তার সাহস এবং কৌশলের কারণে ট্রয়ের সৈন্যরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে থাকলো।
প্রোটেসাইলাস এক গ্রিক যোদ্ধা। ট্রয়ের মাটিতে পা রেখে তার প্রান হারালেন। প্রাণ হারালেও হেক্টরের যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিভা ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধির কারণে অনেক দিন ধরে যুদ্ধ চললো। কিছুতেই জয় নাই গ্রিকদের। তারা সৈকতে দখল নিল এবং সেখানেই ঘাটি গেড়ে বসলো। হেক্টর এবং তার সৈন্যরা নিরাপদে শহরের প্রাচীরের ভেতর অবস্থান করলো।
পারিসের সাথে একবার মেনেলাউসের দ্বন্দ্বের কারণে হল যুদ্ধ । যুদ্ধের দাবী ছিল যদি মেনেলাউস জয়লাভ করে হেলেন তাদের সাথে চলে যাবে তাদের দেশে। আর যদি পারিস জয়ী হয় গ্রিকরা হেলেনকে ফিরিয়ে নেবেন না। প্যারিস ভীতুর ডীম একটা। চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করতে চাইলো না। কঠোরভাবে তিরস্কার করে এই ডুয়েলে অংশগ্রহণের জন্য পারিসকে বাধ্য করলেন।

প্যারিসকে ফিরিয়ে দিচ্ছে ইনোনি; © Antoine Jean Baptiste Thomas
হেক্টরের তিরস্কারের পর পারিস তার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। যুদ্ধ শুরু হলো। অভিজ্ঞ মেনেলাউস দ্রুত ময়দানে জয়ী হতে শুরু করলেন। কিন্তু অ্যাফ্রোডাইটের মায়া লাগলো। পারিসকে রক্ষা করে ট্রয়ের প্রাচীরের ভেতরে তাকে তিনি নিয়ে গেলেন। অন্যদিকে হঠাৎ করে একটি তীর এসে আঘাত করে মেনেলাউসকে। ট্রয় ও গ্রিকদের মধ্যে লেগে গেল ব্যাপক যুদ্ধ । হেক্টর তখন নিজের কর্তব্যবোধে, শহর ও পরিবারকে রক্ষা করবার জন্য যুদ্ধে জড়িয়ে পরলেন। একের পর এক শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সাথে যুদ্ধ করতে হল হেক্টরকে।
লড়াই চলতে থাকে। সুযোগ পেয়ে একপর্যায়ে হেক্টর গ্রিক ঘাঁটিতে আক্রমণ চালায়। অন্যদিকে অ্যাখিলিস অভিমান করে যুদ্ধ থেকে সরে গিয়েছিল। ট্রয়ের সৈন্যরা সাহসের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। অ্যাজ্যাক্স হঠাৎ করে পাথর ছুড়ে হেক্টরকে আহত করে ফেলে। তবে দেবতা অ্যাপোলো এসে হেক্টরকে রক্ষা করেন এবং হেক্টর আবার লড়াইয়ে ফিরে আসেন। কয়েকটি গ্রিক জাহাজ তিনি ধ্বংসও করে ফেলেন।

হেক্টর ও অ্যাখিলিসের যুদ্ধ
হেক্টরের জন্য সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং মুহূর্ত ছিল প্যাট্রোক্লাস, অ্যাখিলিসের বন্ধু হেক্টরের সঙ্গে মুখোমুখি যুদ্ধে লিপ্ত হয়। অন্যদিকে হেক্টর অভিজ্ঞ ছিল, যুদ্ধে তিনি জায়লাভ করেন এবং একপর্যায়ে প্যাট্রোক্লাসের মৃত্যু হয়। অ্যাখিলিস তার প্রিয় বন্ধু প্যাট্রোক্লাসের মৃত্যুতে দিশেহারা হয়ে পরে। তিনি প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য বদ্ধপরিকর হন। তিনি এক অলৌকিক বর্ম গায়ে চাপিয়ে যুদ্ধের মাঠে প্রবেশ করেন। হেক্টর তার পরিবারের অনুরোধ উপেক্ষা করে তার প্রিয় শহর এবং তার পরিবারের সকলকে রক্ষা করবার জন্য অ্যাখিলিসের মুখোমুখি হন। কিন্তু অ্যাথেনা এ ক্ষেত্রে হেক্টরকে সাহায্য করে না বরং হেক্টরকে প্রতারিত করার ফলে অ্যাখিলি তার ঘাড়ে তীর ছুড়ে মারে এবং তিনি মৃত্যুবরণ করে।
অ্যাখিলিস হেক্টরের মরদেহ তার চ্যরিয়েটে বেধে সারামাঠ প্রদর্শন করান। এ দৃশ্য দেখে দেবতা অ্যাপোলোর মায়া হয় হেক্টরের জন্য। তাই মরদেহকে তিনি রক্ষা করেন। একটা পর্যায়ে অ্যাখিলিস হেক্টরের মরদেহ নিয়ে তাদের তাঁবুতে ফেরত যান। হেক্টরের বাবা তার সন্তানের মৃতদেহের এই অপমান সহ্য করতে পারেননি। প্রিয়াম গ্রিক শিবিরে গিয়ে মরদেহ ফেরত নিয়ে আসেন। হেক্টরের মৃত্যুর পর ট্রয়বাসীরা এক বিশাল বিপদের মধ্যে পরে যায়। মর্যাদাপূর্ন সমাধি সম্পন্ন করতে সময় লাগবে। কিছুদিনের জন্য যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা করা হয়। তবে হেক্টরের মৃত্যু ট্রয়যুদ্ধের মোর ঘুরিয়ে দেয়। এবং ইলিয়াড-এর সমাপ্তি আসে।

হেক্টরের মৃতদেহ ট্রয়ে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে © wikipedia
হেক্টর ছিলেন নিঃস্বার্থ, সাহসী, ন্যায়পরায়ণ, পরিবারপ্রেমিক এবং নিজের শহরের প্রতি অদম্য দায়িত্ববোধসম্পন্ন একজন ব্যক্তি। তার সাহস, সততা, প্রেম এবং কর্তব্যপরায়ণতা তাকে ট্রয় যুদ্ধের সবচেয়ে মহান নায়ক হিসেবে চিরকাল স্মরণীয় করে রেখেছে।