আমার স্বামী আজ মৃত। আমি কোনো পুত্র সন্তান জন্ম দিতে পারি নি। এ জন্য আমারই কর্মচারী আমাকে বলপূর্বক (জোরপূর্বক) বিয়ে করতে চাচ্ছে। শুনেছি, তুমি অনেকগুলো পুত্র সন্তানের বাবা। তাদের মধ্য থেকে একজনকে পাঠালে তাকে আমি স্বামী হিসেবে গ্রহণ করবো। আমার পক্ষে কিছুতেই একজন কর্মচারীকে বিয়ে করা সম্ভব নয়” -এমনই ছিলো চিঠিটিতে লেখা। হিট্টাইট রাজা সুপ্পিলুলিউমার কাছে মিশরের একজন রাণী পাঠিয়েছিলেন এই চিঠি। এই রাণী আর কেউ নন, তিনি হলেন তুতেনখামেনের স্ত্রী।
কারা এই হিট্টাইট? কেনোই বা তাদের কাছে রাণী লিখলেন এই চিঠি? নিশ্চয়ই অত্যন্ত যোগ্য ও ক্ষমতাবান কোনো জাতি তারা, যাদের মধ্য থেকে নিজের বর খুঁজে পেতে চাচ্ছিলেন মিশরের রাণী। এনাটোলিয়ার পাহাড়ঘেরা অঞ্চল। হালিশ নদী এঁকেবেকে গিয়ে মিশেছে কৃষ্ণসাগরে। এই উর্বর ভূমিতে বহুদিন ধরে বসবাস করছে হাতিয়ান উপজাতি। অ্যাসিরীয় বণিকদের কাছে তুলা ও কাঠ বিক্রি করে জীবন ও জীবিকা চালায় তারা৷ ঠিক ঐ জায়গায়ই হঠাৎ এসে বসবাস শুরু করে ইন্দো-ইউরোপীয় এক জনগোষ্ঠী। পানির সহজলভ্যতা, গভীর বন, উচ্চভূমি নিঃসন্দেহে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য উপযোগী মনে করে তারা। তাই বুঝে-শুনেই এই অঞ্চল নির্বাচন করেছেন তাদের রাজা। আস্তে আস্তে আশেপাশের দুর্বল রাজ্যগুলোকে দখল করে একটু একটু করে শক্তিশালী হতে থাকে তারা। তুরস্কের এশিয়া অংশকে দখল করে তারা গড়ে তুলেছিলো অতুলনীয় এক সংস্কৃতি। কোন পথ ধরে এই নতুন আবাসস্থলে এসেছিলো, তা আজও আমরা জানি না। সম্ভবত এদের আদিবাস ছিলো ইউরোপ বা ককেশীয় পাহাড়ী অঞ্চলে এবং মুখের ভাষা ছিলো ইন্দো-ইউরোপীয়। হঠাৎ আগত এই ইন্দো-ইউরোপীয় জাতিই ইতিহাসে হিট্টাইট বা হিট্টি নামে পরিচিত। আর এই হিট্টাইটদের একজন পরাক্রমশালী রাজার কাছেই তুতেনখামেনের স্ত্রী পাঠিয়েছিলেন সেই চিঠি।

রাজা সুপ্পিলুলিউমা © worldhistory.org
হিট্টাইটদের ইতিহাস দুই ভাগে বিভক্ত- খ্রিস্টপূর্ব ১৭০০ থেকে ১৫০০ সাল পর্যন্ত পুরাতন হিট্টাইট রাজ্যের যুগ এবং খ্রিস্টপূর্ব ১৪০০ থেকে ১২০০ সাল পর্যন্ত নতুন হিট্টাইট রাজ্যের যুগ। মধ্যবর্তী সময়ে তাদের অবস্থান সম্পর্কে তেমন বিশেষ কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে এটি নিশ্চিত যে, তাদের রাজত্ব ধারাবাহিকভাবেই চলতে থাকে। প্রথম হাত্তসিলি ছিলেন হিট্টাইটদের খ্যাতিমান রাজা। খ্রিস্টপূর্ব ১৭০০ সালে আরজাওয়াসহ আশেপাশের বহু রাজ্য দখল করে সিংহাসনে বসেন তিনি। তার মৃত্যুর পর মারসিলিস ব্যবিলন ধ্বংস করে সেখানে থেকে বুটি সংগ্রহ করে ফেরত আসার পর নিজের বোনের স্বামীর মাধ্যমে আহত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। প্রায় ৬০ বছর গৃহযুদ্ধের ফলে এক পর্যায়ে দুর্বল হয়ে যায় তাদের রাজত্ব ও ভেঙে পড়ে কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা। বেশ কিছু বছর পর আবারও শক্তিশালী এক হিট্টাইট রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটে। একের পর এক নতুন রাজ্য দখলের মাধ্যমে সম্রাজ্যে পরিণত হয় হিট্টাইটরা। তাদের যোগ্য নেতৃত্ব ও অসাধারণ নিয়মতান্ত্রিক সৈন্যদল মিশর, অ্যাসিরিয়াসহ বহু অঞ্চল দখল করে নেয়।
মেসোপোটেমীয়দের কাছ থেকে তারা গ্রহণ করেছিলো লিখিত ভাষার রূপ। লিখিত ভাষা ছিলো বলেই হয়তো আজ আমরা তাদের সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতে পেরেছি। ধর্মের বাণী থেকে শুরু করে প্রাত্যহিক জীবনের সবকিছুই তারা কিউনিফর্ম লিপিতে লিখে রাখতো। আইনকেও সুস্পষ্ট ভাষায় লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলো তারা।
ব্যবিলনীয় হাম্মুরাবির ধারা অনুসরণ করলেও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে আরো সহজ ও সাবলীল ছিলো তারা। অনেকের মতে, প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রথম বার তারাই প্রচলন করেছিলো। ব্যাবিলনের আইনের কঠিন শাস্তির ব্যবস্থাকে এড়িয়ে নমনীয় বিচার-ব্যবস্থা গড়ে তোলে তারা। তারা প্রতিশোধমূলক আইনের কঠিন শাস্তি মৃত্যুদন্ড বা শিরঃচ্ছেদের পরিবর্তে নগদ অর্থে ক্ষতিপূরণের ধারা চালু করে। হিট্টাইটদের শহরগুলোর ভেতরে রাজ্যের ছোট-খাটো সমস্যা সমাধানের জন্য থাকতেন উপদেষ্টামন্ডলী৷ তবে বড় সমস্যাগুলোর সমাধান, মৃত্যুদন্ড ইত্যাদি রাজার অধীনেই ছিলো। দূরে অবস্থিত করদ রাজ্যগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও ট্যাক্স দেখাশোনার ক্ষেত্রে রাজা নিজেই দায়িত্ব পালন করতেন। নিজের সন্তান ও আত্মীয়দের উপরও অর্পণ করতেন বিভিন্ন দায়িত্বভার।
রাজার মর্যাদা ছিলো সবার উপরে। সামরিক বাহিনীর প্রধান ও মুখ্য বিচারপতিও তিনি। এমন বিশ্বাস ছিলো যে, স্বর্গ থেকে দেবতারা রাজা নির্বাচন করে মানুষের কাছে পাঠান। তাই রাজাই রাজ্যের প্রধান পুরোহিত। মন্দিরগুলোতে পূজার সাথে সাথে রাজ্য পরিচালনার কাজগুলোও সংঘটিত হতো। আরও বিশ্বাস করা হতো যে, রাজার কাজ মানুষের মঙ্গল করা এবং প্রজার চাহিদা, ইচ্ছাসহ সমস্ত বার্তা রাজাই পৌঁছে দেন দেবতাদের কাছে। এমনকি দেবতাদের উদ্দেশ্যে মানুষের প্রার্থনার বার্তাও তিনি পৌঁছে দেন। হিট্টাইটদের বিশ্বাস, রাজা মানুষ হিসেবে জন্ম নিলেও মৃত্যুর পর তিনি নিজেও দেবতায় পরিণত হয়ে যাবেন। তাই মৃত সম্রাটকেও উপাসনা করতো প্রজারা। রাজার সাথে সাথে রাজপরিবারের সদস্যরাও এই উপাসনা পেতেন প্রজাদের কাছ থেকে।
রাজা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় তিনি উচ্চারণ করতেন চন্দ্রদেবতা ও সূর্যদেবতার নির্বাচিত নীতি। প্রজাদেরকে সব ধরনের বিপদ থেকে মুক্ত রাখাই তার দায়িত্ব। ফসল তোলার মৌসুম উপলক্ষে দেবতার উপাসনার জন্য রাজাকে সশরীরে উপস্থিত থেকে রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে সফরে যেতে হতো। কেননা যদি দেবতারা ঐ পূজার মাধ্যমে সন্তুষ্ট হন, তবেই প্রজারা সুখে থাকবে, নতুন প্রজন্মের জন্ম হবে এবং রাজা রাজ্য জয়ে বিজেতা হবেন। রাজার জন্ম, মৃত্যু ও সিংহাসনের অভিষেকও পালিত হতো মহা আড়ম্বর করে। মিশরের রাজার সাথে হিট্টাইটদের পার্থক্য হচ্ছে, মিশরীয় রাজারা নিজেদেরকে মানুষ মনে করতো, দেবতা না। তারা বহু দেবতায় বিশ্বাসী ছিলো। তারা কোনো রাজ্য দখল করলে সেই রাজ্যের দেবতাকেই নিজেদের করে নিতো। ধর্মীয় ক্ষেত্রে এমনই উদার মানসিকতার ছিলো তারা।
হিট্টাইট সমাজে নারীর জন্য আইন ছিলো সুনির্দিষ্ট। বিয়ের সময় পাত্রীর পরিবারকে পণ দিতে হতো পাত্রপক্ষের। স্ত্রীর দায়িত্ব ছিলো সন্তান ধারণ এবং স্বামীর পাশে থেকে মতামত ও পরামর্শ দিয়ে তাকে সাহায্য করা৷ বিবাহ-বিচ্ছেদের সময় নারীরা স্বামীর কাছ থেকে কমপেনসেশনও পেতো।

হিট্টাইট লৌহ অস্ত্র: প্রাচীন বিশ্বে ক্ষমতার পথ তৈরি করা © wikimida
কৃষিজীবি সমাজ ব্যবস্থা ছিলো হিট্টাইটদের। গম ও বার্লি উৎপাদনে তারা ছিলো পারদর্শী। গরু, ভেড়া, ষাঁড় ও বলদ ছিলো তাদের পোষা প্রাণী। খনিজ সম্পদের প্রাচুর্য ছিলো হিট্টাইট রাজ্যের প্রধান শক্তির উৎস। তামা, সীসা, রূপা, লোহা ইত্যাদি খনিজ আকরিক উত্তোলন করে এক শক্তিশালী রাষ্ট্রের সূচনা করে তারা। ধাতুবিদ্যায় তাদের জ্ঞান সমসাময়িক অন্যান্য রাজ্যের চেয়ে তাদেরকে অগ্রগামী হতে সাহায্য করেছে। সম্ভবত তারাই প্রথম লোহার ব্যবহার শুরু করেছিলো। হিট্টাইট যুগের কামাররাও ছিলো অত্যন্ত সম্মানিত। তাদের শৈল্পিক স্পর্শে তৈরী নানা রকম পণ্যের সুনাম ক্রমেই আক্কাদিয়া, ব্যবিলন, সুসা এবং অ্যাসিরিয়া অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
হিট্টাইটরা চ্যারিয়টের আবিষ্কারক না হলেও এর আধুনিকতার জন্য তারা এতে নিয়ে এসেছিলো বিশাল পরিবর্তন। তাদের চাকাগুলো ইস্পাতের তৈরী হবার কারণে সমসাময়িক যে কোনো রথের তুলনায় তাদেরটি ছিলো অনেক বেশি দ্রুতগামী। অস্ত্র বা রথ তৈরীর সময় তারা যখন ইস্পাতের ব্যবহার শুরু করেছিলো, তখন সমসাময়িক অনেক রাষ্ট্রই ব্রোঞ্জের তৈরী অস্ত্র বা চ্যারিয়েটে অভ্যস্ত। এই বিষয়টি গবেষকদের ভীষণভাবে বিস্মিত করে। ধাতু ব্যবহারের ইতিহাস সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য হন তারা।
চ্যারিয়টে ঘোড়ার ব্যবহারও শুরু হয় হিট্টাইটদের সময়ে। দুই চাকার চ্যারিয়টে দুজনের জায়গায় তিনজন মানুষের উপস্থিতি যুদ্ধের সময় তাদেরকে বাড়তি শক্তি দিতো, কেননা একজন চালক ও আরেকজন ধনুক বা বর্শা ব্যবহারকারী সৈন্যের সাথে বর্ম হাতে তৃতীয় একজন সৈন্য তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করতে পারতো। চ্যারিয়েটের এই উন্নয়ন তাদেরকে মেডিটেরিয়ান অঞ্চলের এক শক্তিশালী খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত করেছিলো। ঘোড়ার প্রশিক্ষণেও তারা ভীষণ গুরুত্ব দেয়। সঠিক ঘোড়া নির্বাচন করার পর ১৮৪ দিন ধরে প্রশিক্ষণ প্রদান, ব্যয়াম, খাদ্য নির্বাচন ইত্যাদি সমস্ত খুঁটিনাটি বিষয়ই লিপিবদ্ধ ছিলো তাদের লেখা মাটির ট্যাবলেটগুলোতে।

পুনর্গঠিত: হিট্টাইটদের প্রাচীন রাজধানী © turkisharchaeonews.net
দুর্যোগপূর্ণ সময়ে শহরবাসীকে নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দেবার জন্য শহরের দরজা খুলে দেয়া হতো এবং সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রতি রাতেই ফটকগুলো সীল দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হতো। পরের দিন সকালে আবারো ভালোভাবে পরীক্ষা করে সীল ভেঙে চলাচলের ব্যবস্থা নেয়া হতো। খ্রিস্টপূর্ব ১৪০০ সাল পর্যন্ত শান্তিতেই ছিলো হিট্টাইট জনগণ। তবে এর কিছুকাল পরই চারদিক থেকে মিশরসহ আরও বেশ কয়েকটি রাজ্য তাদের আক্রমণ করতে থাকে৷ কিন্তু হিট্টাইট সৈন্যবাহিনী তা প্রতিহত করতে পারে না৷ ফলে এনাটোলিয়ার ছোট একটি রাজ্য হিসেবে বেঁচে থাকে হিট্টাইটরা।
তাদের সময়ে মিশরের রাজা অন্য রাজাকে লেখা চিঠিতে ভাষা ছিল –“শুনতে পেলাম হিট্টাইট শেষ। মাথা তুলে দাঁড়াবার শক্তিও আর তাদের নেই। না, তারা ভীষণ ভুল ছিলো!” তবে এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। ছাই থেকে আবারও ফিনিক্স পাখির মতো উঠে দাঁড়ায় হিট্টাইটরা। রাজাদের রাজা সুপ্পিলুলিউমা নতুন জীবন দেন হিট্টাইটদেরকে। তিনি ছিলেন পোড়-খাওয়া যোদ্ধা, একজন দারুণ রাজনীতিবিদও। লালিত-পালিত হয়েছেন সৈন্য হিসেবে। তার বাবা যখন রাজা, হিট্টাইট তখন ক্ষুদ্র একটি রাজ্য। তার বাবা সেনাবাহিনীকে সংগঠিত করে। রাজপুত্র সুপ্পিলুলিউমাকে সাথে নিয়ে একের পর এক রাজ্য পুনরুদ্ধার করতে থাকেন তিনি। ভাগ্য খারাপ ছিলো। বাবা হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। কিন্তু মৃত্যুর আগে সুপ্পিলুলিউমাকে রাজা হিসেবে নির্বাচন না করে অন্য আরেক সন্তানকে রাজা ঘোষণা করে যান তিনি৷ প্রচন্ড রাগে-অভিমানে উত্তরাধিকারের আইন অগ্রাহ্য করে ভাইকে হত্যা করে নিজেকেই রাজা হিসেবে ঘোষণা করেন সুপ্পিলুলিউমা।
একে একে প্রতিটি হারিয়ে যাওয়া রাজ্য পুনঃরুদ্ধার করে নেন সুপ্পিলুলিউমার নিয়মতান্ত্রিক সৈন্যদল ও চ্যারিয়ট-ফোর্স৷ অপ্রতিরোধ্য এক সৈন্যদল বিশাল সম্রাজ্য গড়ে তোলে হিট্টাইটদের জন্য। একদিকে ব্লাক সি, লেবাননের পাহাড় সাউথ এস্টেট ইউফ্রেটিস বিজেতা তারা ঠিক তখনই মিশর থেকে তুতেনখামেনের বিধবা স্ত্রীর লেখা চিঠিটি। চিঠি পেয়ে অবাক বনে যান সুপিল্লুলিমা। এ তো বিশাল এক সুযোগ! সন্দেহ ও আশঙ্কা দূরে ঠেলে ছেলেকে পাঠিয়ে দেন তিনি মিশরের রাণীর সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হবার জন্য। না, আবার বিপদ। পথে রানীর বিরুদ্ধে যাওয়া দল হত্যা করে সুপিল্লুলিমার ছেলেকে। ব্যস, সন্তানের হত্যার প্রতিশোধ নিতে যুদ্ধ শুরু হয় মিশরের সাথে। সুপ্পিলুলিউমা তছনছ করে দেন মিশরের কিছু অঞ্চল। কাউকে ছাড় দেন না তিনি এবং বিজয়ীর বেশে ফিরে আসেন নিজ ভূমিতে। সাথে নিয়ে আসেন যুদ্ধবন্দীদের। তবে সেই সাথে আসে ভয়ানক বিপদ, প্লেগ। বন্দীরা অনেকেই আক্রান্ত ছিলো প্লেগ রোগে। সেখান থেকেই হিট্টাইটদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে এই মহামারী, ধরে বসে সুপ্পিলুলিউমাকেও। অবশেষে খ্রিস্টপূর্ব ১৩২২ সালে ২২ বছর রাজত্বের পর মরণব্যাধি প্লেগ আক্রান্ত শক্তিশালী রাজা সুপ্পিলুলিউমা মৃত্যুবরণ করেন।

যুদ্ধবন্দীদের সাথে ছড়িয়ে পড়া প্লেগ: যে মহামারী থামিয়ে দিয়েছিল হিট্টাইট সাম্রাজ্যের অগ্রযাত্রা © BBC
সুপ্পিলুলিউমার মৃত্যুর পর তার ছেলে দ্বিতীয় মুর্সিলি রাজা হিসেবে অভিষেক নেন। বাবার মৃত্যুর পর বড় দুই ভাইয়ের মৃত্যু, নিজের স্ত্রীর মৃত্যু সব মিলিয়ে বিমর্ষ হয়ে পড়েন মুর্সিলি। তবু দায়িত্ববোধে অটল তিনি। অল্প বয়সে রাজত্ব শুরু করতে পারার সুবাদে রাজ্যকে একটু একটু করে ব্যবিলনের মতোই শক্তিশালী করে তোলেন তিনি। তার মৃত্যুর পর রামেসিস ২ হিট্টাইট আক্রমণ করলে হাতুসিলি ৩ নিজে দায়িত্ব নিয়ে আগায়।
বিস্ময়কর উন্নত এই হিট্টাইট সভ্যতা খ্রিস্টপূর্ব ১১৯০ সাল পর্যন্ত টিকে ছিলো। বহু আগে হিব্রুদের বাইবেল থেকে জানা গিয়েছিলো এই হিট্টাইটদের কথা, যারা ইসরাইলীদেরকে বিভিন্ন সময় দেবদারু গাছ, রথ ও ঘোড়া উপহার হিসেবে পাঠাতো। আমানা থেকে পাওয়া চিঠিগুলোতেও এই জাতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হোমারের কাব্যেও তাদের বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু ইতিহাসবিদরা এদের কারো সাথেই হিট্টাইটদের যোগসূত্র স্থাপন করতে পারেন নি।
এই জাতি তাদের ইতিহাস সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন ছিলো বলে তাদের স্ক্রাইবরা ট্যাবলেটে সমস্ত কিছুই লিখে রাখতেন। রাষ্ট্র পরিচালনায়ও স্ক্রাইবদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিলো। বহু বছর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করে বিভিন্ন ভাষার দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে তারা সেই দায়িত্ব পেতেন। তাদের যোগ্যতা এতোই বেশি ছিলো যে, তারা সম্রাটকে বিভিন্ন সময়ে নানা রকম পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করতেন। সমসাময়িক ঘটনা ছাড়াও প্রাচীন গল্পগুলোকে অনুলিপি করে নতুনভাবে তা সংরক্ষণ করতেন তারা। তাদের সাহিত্য থেকে তাদের মূল্যবোধ, রাজ্যের সমৃদ্ধি ও সমাজ ব্যবস্থার ধরন সম্পর্কে জানা যায়। পরবর্তীতে গ্রীক ও রোমান সাহিত্য অনেক বেশি অনুপ্রাণিত হয়েছিলো তাদের লেখনী থেকে৷

প্রাচীন ফলকটিতে হিট্টাইট এবং হুরিয়ান উভয় ভাষায় কিউনিফর্ম লেখা খোদাই করা আছে। © Kimiyoshi Matsumura
পৃথিবীর ইতিহাসে যাদের এতো অবদান, তারা কিন্তু হারিয়ে গিয়েছিলো ইতিহাসের অন্ধকারে। ১৯০৬ সালে তুরস্কের বোঘাজকোই নামের একটি স্থানে খনন করবার সময় হঠাৎ করেই বের হয়ে আসে প্রাচীন এই হিট্টাইট সভ্যতার নিদর্শন। পাথরের তৈরী উঁচু উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা শহর, মন্দির, প্রাসাদ, স্মৃতিস্তম্ভ -সবই বের হয়ে আসে প্রত্নতাত্ত্বিকদের সামনে। আজও বিজ্ঞানীদের মনে এই সভ্যতার ধ্বংসাবশেষে মেলা গাঢ় সবুজ পাথরগুলো নানা রকমের প্রশ্ন তৈরী করে। পাথরগুলো ছিলো ভীষণ মসৃণভাবে পলিশ করা। এই সবুজ পাথর কোথা থেকে আসলো বা কিভাবে এর ব্যবহার হয়েছিলো, তা আজও আমাদের কাছে এক অজানা রহস্য। তাছাড়াও মন্দির বানাবার সময় যে পাথরগুলো ব্যবহার করা হতো, তা এতো সূক্ষ্মভাবে জোড়া দেয়া হয়েছিলো যে, একটি কাগজও কোনোভাবেই এর মধ্য দিয়ে ঢোকানো যেতো না। কিছু পাথর এতো নিখুঁতভাবে ছিদ্র করা হয়েছিলো যে, বিশ্বাস করতে অবাক লাগে, আধুনিক ড্রিল মেশিন ছাড়া কেমন করে ঐ পাথরগুলোকে এতো দক্ষতার সাথে ছিদ্র করে তা দিয়ে স্তম্ভ বা ভাস্কর্য তৈরী করা সম্ভব হয়েছিলো? কে জানে?
যাই হোক খনন থেকে উদ্ধার হওয়া কূটনৈতিক বা বাণিজ্যিক চিঠিসম্বলিত প্রায় ১০০০ কিউনিফর্ম পাঠের মাধ্যমে জলের মতো পরিস্কার হলো হারিয়ে যাওয়া হিট্টাইট জাতির ইতিহাস। সমগ্র পৃথিবীর কাছে উন্মোচিত হলো সুসভ্য এক দল মানুষের গল্প।

