মোগল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন যোগ্যতম রাজকন্যা। একজন কবি, একজন সুফি, একজন স্থপতি, সর্বোপরি একজন যোগ্য ব্যবসায়ী ও বটে। উত্তরাধিকার যুদ্ধে আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে দাড়িয়ে ভাই দাঁড়ার পক্ষ নিলেও আওরঙ্গজেব যখন সম্রাট হন তখন জাহানারাকেই তার যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতার কারণে ”পাদিশাহ বেগম” উপাধি দেন। স্থপতি হিসেবেও যোগ্যতার প্রমাণ তিনি রেখেছেন। সেই গল্পই আজ বলবো।
সম্রাট শাহজাহান স্থির করলেন আগ্রা থেকে তার রাজধানী স্থানান্তরিত করে দিল্লি নিয়ে আসবেন। শাহজাহানাবাদ নাম রাখলেন শহরটির। মসজিদ, সরাইখানা, বিরাট প্রাসাদ, বাজার সমস্ত কিছুর সমন্বয়ে বিশাল এক নগর তৈরীর পরিকল্পনা হাতে নিলেন তিনি। লালকেল্লাকে ঘিরেই গড়ে উঠবে শহরটি। এই ক্ষেত্রে তার সাথে কাজ করতে এগিয়ে আসলেন তার প্রিয় কন্যা জাহানারা। হাতে নিলেন চাঁদনী চক তৈরির পরিকল্পনা।

জাহানারা বেগম ছিলেন মুঘল সম্রাট শাহজাহান ও তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী মুমতাজ মহলের কন্যা এবং মুঘল দরবারের অন্যতম ক্ষমতাধর রাজকুমারী। © wikipedia
দিল্লি তখন সমগ্র এশিয়ার মধ্যে শক্তিশালী এক রাজধানী। বিশ্বের বিভিন্ন অংশ থেকে ব্যবসায়ীরা বাণিজ্যের উদ্দেশ্য ছুটে আসতো দিল্লিতে। দাদা জাহাঙ্গীরের সময় থেকে ব্যবসায়িক হাব হিসেবে গড়ে উঠেছিল মোগল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন শহরগুলো। আর নাতনি জাহানারা এই শাহজাহানাবাদকেই আরো ব্যবসা বান্ধব করে তোলার সিদ্ধান্ত নিলেন । ইউরোপীয় এবং এশিয়ার বিভিন্ন বণিকেরা যাতে এই দূর দেশে এসে আরামে ব্যবসা বাণিজ্য করতে পারে সেই জন্য দিল্লির উপকণ্ঠে একটি সরাইখানা তৈরির সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি।
বাবার মতোই উচ্চাভিলাসী এই রাজকন্যার ইচ্ছা হিন্দুস্থানের মধ্যে সবচাইতে বড় সরাইখানাটি তিনি তৈরি করবেন। যাতে করে এই সরাইখানায় প্রবেশের সাথে সাথে দূর-দূরান্ত থেকে আসা পথিকদের দেহ ও মনের ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। তার বিশ্বাস ছিল এই সরাইখানা শুধু ভারতবাসীই না সমগ্র বিশ্বের কাছে তাকে অমর করে রাখবে।

১৮ বছর বয়সে জাহানারা বেগম © wikipedia
চারবাগের মধ্যে অবস্থিত এই সরাইখানার সৌন্দর্য যে কোন পথিকের পথ চলাকে থামিয়ে দিতো। অপার সৌন্দর্যের আধার ছিল এটি। এবার দ্বিতীয় ধাপে তৈরি হয়ে গেল মার্কেট। সরাইখানার পাশেই মার্কেটটি তৈরি করার ফলে ফুলেঁফেপে উঠল ব্যবসা। এই মার্কেটটি শাহজাহানাবাদের লাহোরীর দরজা থেকে এক কিলোমিটার লম্বা ও ১২০ কিলোমিটার চওড়া ছিল। রাজকুমারীর তীক্ষ্ণ বুদ্ধির ফলেই অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হলো শাহজাহানের রাজত্বকাল।
আজ এই বাজার চাঁদনী চক নামে পরিচিত। তবে শুরুর দিকে এই মার্কেটের নাম কি ছিল তা আজও আমরা জানিনা। এই বাজারের কিছু লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্যের কারণেই এটি ধীরে ধীরে চাঁদনী চক হিসেবে পরিচিত পায়। জাহানারার তৈরি এই বাজার কিভাবে চাঁদনী চকে রূপান্তরিত হলো তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন। চাঁদনিচক বাজার এবং সরাইখানা নির্মাণের পর ঐ এলাকার পানির প্রয়োজনীয়তা মেটাবার জন্য যমুনা নদী থেকে খাল কেটে পানি আনা হয়েছিল। এই খালটি বাজারের একমাথা থেকে অন্য মাথা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
এছাড়াও বাজারের ঠিক মধ্যেখানে জাহানারা তৈরি করেছিল এক বিশাল জলাশয়। জলাধারটি খুব একটা গভীর না হলেও এর সৌন্দর্য বাজারটির সৌন্দর্য বহু গুনে বাড়িয়ে দিয়েছিল। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত লোকের সমাগম হতো। দিনরাত ভরে চলত ব্যবসা, পণ্যের বিনিময়। অনেক রাত অব্দি ব্যবসায়ীরা সেখানে অবস্থান করত। সেই জলাশয়ে চাঁদনী রাতে চাঁদের রূপালী আলো ও তার আভা প্রতিফলিত হত। সেই চাঁদের আলো ও জলাশয়ের পানির মধ্যকার লুকোচুরি খেলা থেকে বাজারটির নামই হয়ে গেল চাঁদনী চক।
অন্য একটি কারণও থাকতে পারে এই নামকরণের পিছনে। বিখ্যাত বার্নিয়ার বাজারের বর্ণনায় বলে গিয়েছেন এই বাজারের বেশিরভাগ দোকান ছিল অর্ধচন্দ্রাকৃতি। অর্ধচন্দ্রাকৃতির এই নকশার কারণেও হয়তো এটিকে চাঁদনী চক বলে ডাকা হতো। শাহজাহানাবাদের তৈরির সময় সম্ভান্ত্র পরিবারের মানুষের জন্য কিছু আবাসিক এলাকা ও তৈরির পরিকল্পনা করেছিলেন এবং আমির ওমরাহ সৈন্যবাহিনীর পরিবারের লোকজনেরা এরই আশেপাশে বসতি স্থাপন করেছিল।

চাঁদনী চক © wikipedia
এই যমুনার খাল দিয়েই ঐ এলাকাতে পানি সরবরাহ চলত। আজও সেই সময়কার তৈরি কিছু কিছু বাড়ি সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। এগুলোকে হাভেলি বলা হতো। হাভেলিতে বসবাস করত বনেদি পরিবারের মানুষেরা। ওখানের এক হাভেলিতে বসবাস করত মির্জা গালিব। মির্জা গালিবের হাভেলি ছিল বাল্লিমারো এবং গালিবের বিভিন্ন লেখা থেকে খুঁজে পাওয়া যায় শাহজাহানের তৈরি চাঁদনী চককে কিভাবে ইংরেজরা ধ্বংসের দিকে নিয়ে গিয়েছিল।
সিপাহী বিদ্রোহের পর ইংরেজরা কামানের তোপে উড়িয়ে দিয়েছিল বহু স্থাপনা। আজ আমরা দিল্লিতে যে চাঁদনী চক দেখতে পাচ্ছি তার মধ্যে শাহজাহানাবাদের চাঁদনী চকের সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া যাবে না; পাওয়া যাবেনা সেই স্থপতিদের হাতের কাজ। তাই চলুন একটু চোখ বন্ধ করে জাহানারার সেই চাঁদনিচকে ঘুরে আসি। কোন এক সন্ধ্যায় যদি মোঘল যুগের কেউ হয়ে যেতে পারি তাহলে দেখতে পেতাম সন্ধ্যার সেই দৃশ্য। আশেপাশে মোঘলদের বাড়ি।
কেউ রুটি, কেউ মাংস, দুধ, কিনতে আসছে। দোকানিরা হল্লা করে বিক্রি করছে তাদের পণ্য। সামনে আরেকটু আগালেই খুঁজে পাওয়া যাবে সোনা, রুবি, পান্না, মানিক বিক্রির জহুরিরা বসে আছে। রাজ পরিবারের সন্তানেরা তাদের বিশাল দলবল নিয়ে কেনাকাটা করছে দামি দামি রত্ন হার। আরেকটু দূরে কাপড়ের দোকানে বিক্রি হচ্ছে ঢাকাইয়া মসলিন। শুধু ঢাকাইয়া মসলিন না, দেশি-বিদেশি নানা রকম কাপড় সাজিয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে উচ্চ পদস্থ কোন এক সরকারি কর্মচারীকে। এখানকার মানুষের ভাষা, সহবত সবই একেবারেই ভিন্ন। আকাশে মস্ত চাঁদ উঠেছে। সেই চাঁদের আলো গিয়ে পড়লো জাহানারার জলাধারে। মোহনীয় এক সৌন্দর্য এবং দোকানের অসাধারণ পণ্যগুলো প্রতিমুহূর্তে চমকিত করছে প্রতিটি ক্রেতাকে। হঠাৎ করে দেখা যাচ্ছে দলে দলে হেঁটে যাচ্ছে পর্তুগিজ, ডাচ, ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরা। আরবের বণিকেরা ঘোড়ায় চড়ে যাচ্ছে। শুধু আরব কেন পারস্য চিন থেকেও নিয়ে আসা হচ্ছে নানা রকম মনহারী দ্রব্য। এখানে চীনের চশমা খুবই জনপ্রিয় ছিল।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৯০২ সালের চিত্রকর্ম: শাহজাহানের মৃত্যুক্ষণে কন্যা জাহানারা বেগমের পাশে। যখন সম্রাট দূরের তাজমহলের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছেন। © wikipedia
ব্যবসায়ী জাহানারা বেগম তার যোগ্যতার মাধ্যমে সফল বাজার উপহার দিয়েছিল মোগল সাম্রাজ্যকে। তিনি জাহাজের ব্যবসা করে দাস ব্যবসায়ী ও ইউরোপীয়দের সাথে সমানতালে ব্যবসায়ীক প্রতিযোগিতায় নামতেন। আবার হয়তোবা পণ্য এনে বিক্রি করেছেন এই বাজারেই। আসলে জাহানারার গুণের কথা বলে শেষ করা যাবে না। অসম্ভব ধনী এই মহিলা শিক্ষার জন্যও দান করেছেন। তবে আজ সেই সোনালী দিন হারিয়ে গিয়েছে। ধ্বংস হয়ে গিয়েছে জাহানারার তৈরি ইমারত। ছবিতে আমরা দেখতে পাই কি অসাধারণ সুন্দর এক স্থাপত্যে কলার জন্মযাত্রী ছিলেন জাহানারা। তাই যতই এর সৌন্দর্য কমে যাক না কেন তার পরেও যতদিন এই চাঁদনী চক থাকবে ততদিন এই জাহানারা বেঁচে থাকবে।

