১৪ অক্টোবর ১৯৫৪ সাল।”জলখাবার” “জুয়েল হাউজের” সামনের রাস্তায় হঠাৎ ট্রামচালক খেয়াল করলেন, একজন মানুষ রাস্তা অতিক্রম করছেন। চলনে অন্যমনস্কভাব। অবিরাম ঘণ্টা বাজাচ্ছেন চালক। চিৎকার করছেন। কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। মানুষটির থামার কোনো লক্ষণই নেই। দ্রুত পারও হচ্ছেন না রাস্তা। প্রাণপণে ট্রাম থামানোরও চেষ্টা করছেন চালক। একপর্যায়ে গাড়ি থামল বটে। কিন্তু ততক্ষণে যা ঘটার তাই ঘটল। প্রচণ্ড ধাক্কায় মানুষটির দেহ ক্যাচারের ভিতরে ঢুকে গেছে। অনেক কষ্টে সবাই মিলে টেনেহিঁচড়ে রক্তাক্ত দেহ বের করলেন। কেটে ছিঁড়ে থেঁতলে গেছে সারা দেহ। ভেঙে গেছে বুকের পাঁজর, ডানদিকের ঊরুর হাড়।হাসপাতালে নেওয়া হলো। এই মানুষটি কবি জীবনানন্দ দাশ। রবীন্দ্র পরবর্তী যুগে বাংলা সাহিত্যে যার কবিতা সবথেকে বেশি সমাদৃত ও অনুসৃত। রবীন্দ্র, নজরুলের পর জীবনানন্দই আধুনিক কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম এ কথা আজ স্বীকৃত।

দুর্ঘটনার পর কিন্তু কবি জীবনানন্দ দাশের বেঁচে থাকার আকুতি ছিল। তার দুর্ঘটনার খবরের পর বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন সবাই ছুটে আসেন হাসপাতালে। বাদ যাননি কলকাতার বড় চিকিৎসকরাও। সবাই মিলে শেষ চেষ্টা করেছেন। এ প্রসঙ্গে সুবোধ রায় লিখেছেন, ‘শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে দুই নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয় কবিকে। খবর পেয়ে দেখতে আসেন অনেকেই।এসে পড়েন কবির নিকটাত্মীয় স্বনামধন্য চিকিৎসক শ্রী অমল দাশ এবং আরেকজন বিশেষজ্ঞ ড. একে বসু। ডাক্তার অমল দাশকে দেখে বড় প্রাণ এলো কবির, ‘কে বুলু? বাঁচিয়ে দে…। শিশুর মতো অসহায় কণ্ঠ বুলু, বাঁচিয়ে দে ভাই!’ ডাক্তাররা শেষ চেষ্টা করলেন। পারলেন না। কবির শেষ আকুতি সবাইকে আপ্লুত করেছিল। কিন্তু কিছুই হলো না। ধানসিঁড়ি নদী পেরিয়ে কবি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। আটদিন মৃত্যুর সাথে লড়াইয়ের পর কবি পরাজিত হলেন মৃত্যুর কাছে , দিনটি ছিল ২২ শে অক্টোবর, ১৯৫৪,বাংলা ৫ই কার্ত্তিক। আগেই লিখে গিয়েছিলেন, ‘পাই নাই কিছু, ঝরা ফসলের বিদায়ের গান তাই গেয়ে যাই আমি, মরণেরে ঘিরে এ মোর সপ্তপদী।’ ‘যে ঘুম ভাঙে নাকো কোনো দিন ঘুমাতে ঘুমাতে সবচেয়ে সুখ আর সবচেয়ে শান্তি আছে তাতে।’

কবির মৃত্যুর পর ঝড় ওঠে বাংলাজুড়ে। কবি কি আত্মহত্যা করেছেন না দুর্ঘটনার শিকার? কবির পরিবার থেকে বলা হলো তিনি কখনোই সুখী ছিলেন না পারিবারিকভাবে। এই কারণে আত্মহত্যা করেছেন। কবি সঞ্জয় ভট্টাচার্য লিখেছেন, আমার মনে হয় জীবনানন্দ ঠিক ট্রাম দুর্ঘটনায় মারা যাননি। যদিও এই কথাটাই সর্বত্র বলা হয়ে থাকে আমরা দেখেছি : তথাপি আমার ধারণা তিনি আত্মহত্যা করেছেন। জীবনানন্দের আত্মহত্যা প্রসঙ্গে কবির আট বছর আগের একদিন কবিতাটিও আলোচনায় ছিল। কারণহীন স্বেচ্ছামৃত্যুকে তিনি ব্যবহার করেছিলেন এই কবিতায়। প্রায় একই রকম মন্তব্য করেছেন কবি ও জীবনানন্দ গবেষক ভূমেন্দ্র গুহ। তিনি বলেছেন, ‘কলকাতার ইতিহাসে জীবনানন্দই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ট্রাম দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। তার লেখাগুলো পড়লেই বোঝা যায়, তিনি মৃত্যুচিন্তায় চিন্তিত ছিলেন। এক্ষেত্রে এটা আত্মহত্যা হলেও হতে পারে।’ আসলে মৃত্যু এমন একটি বিষয় যা কারও আওতাধীন নয়। তাই জীবনানন্দের মৃত্যু বহুকাল ধরে কেবল রহস্যাবৃতই থেকে গেল। বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। কবির সহধর্মীণি লাবণ্য দাশের কথায় আত্মহত্যার বিষয়টি সামনে চলে আসে। তার উক্তি ছিল: ‘মৃত্যুর পরপার সম্পর্কে ওর একটা অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল। মাঝে মাঝেই ওই কথা বলতেন। বলতেন, মৃত্যুর পরে অনেক প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা হয়। আর খালি বলতেন, আচ্ছা বলতো আমি মারা গেলে তুমি কী করবে?’ (আমার স্বামী জীবনানন্দ দাশ, লাবণ্য দাশ)। জীবনানন্দ দাশের কবিতার সমালোচকের অনেকেই তাঁর কবিতার ধারা বিশ্লেষণ করে আত্মহত্যার বিষয়টি সামনে এনেছেন। কবির অনেক কবিতাই যে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে যাওয়ার পর আবার মায়ায় ফিরে আসার।

ট্রাম দুর্ঘটনায় মৃত্যু সাধারণ কোনো দুর্ঘটনা না আত্মহত্যা ; এবার সেই দুর্ঘটনার কথায় আসি। প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যে জানা যায়, জীবনানন্দ দাশ যখন ট্রাম লাইন পার হচ্ছিলেন তখন তার হাতে ডাব ছিল। একজন মানুষ হাতে ডাব নিয়ে আত্মহত্যা করতে পারেন কি না এ নিয়ে প্রশ্ন থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এর পরের প্রশ্নটা হলো, সেই ট্রাম দুর্ঘটনা যদি হয় একশ বছরে হয় একটি এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটি জীবনানন্দ দাশের , তাহলে প্রশ্ন আসবেই -কেন!দেশপ্রিয় পার্কের কাছে ট্রামলাইনে উঠে জীবনানন্দ কি এতটাই অন্যমনস্ক, বিক্ষিপ্তচিত্ত ছিলেন যে ঘণ্টি বাজিয়ে ট্রাম আসছে বুঝতে পেরেও (কারও মতে দেখতে পেয়ে, এমনকি ড্রাইভারের চিৎকার বা ধমক সত্ত্বেও) আত্মরক্ষার কোনো তাড়া বোধ করেননি? কিংবা আজীবন আত্মভোলা, নিঃসঙ্গ কবির মনে কি তাঁরই স্বরচিত অদ্ভুত আঁধার জেঁকে বসেছিল, তিনি কোনো চিত্তচাঞ্চল্য বোধ করেননি?

উত্তর খুজতে গিয়ে দেখা যায়, শেষ কয়েকবছর কবি জীবনানন্দ দাশ চরম অর্থকষ্টে ছিলেন। তুচ্ছ কারণে একটার পর একটা চাকরি হারিয়েছেন। কলকাতার ১৮৩ নম্বর ল্যান্সডাউন স্ট্রিটের একটি ভাড়াবাড়িতে থাকতেন। লাবণ্যগুপ্তর অসুস্থতা সহ পুরো পরিবারের ভার তাকে অস্থির এবং ক্রমশ অসহায় করে তুলেছিলো। নিদারুণ অর্থকষ্টে ভাড়াবাড়ির একটা ঘর সাবলেটও দিয়েছিলেন বেআইনিভাবে একজন নর্তকীর কাছে, যিনি কবি’র লেখা পড়ার পরিবেশ এবং সকল নৈঃশব্দ্য ভেঙে দিয়েছিলেন। টিউশনি করেছেন, এমন কি বিমা কোম্পানির দালালি পর্যন্ত করেছেন। টাকা ধার করেছেন সম্ভব-অসম্ভব যে-কোনও সূত্র থেকে : ভাই-বোন, ভাইয়ের বউ, বিমা কোম্পানি, স্কটিশ ইউনিয়ন, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, সত্যপ্রসন্ন দত্ত, বিমলাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, বাণী রায়, প্রতিভা বসু সহ আরো অনেকের কাছ থেকে। শোধ করেছেন ভেঙে ভেঙে। মৃত্যুর কয়েকমাস আগে স্বরাজ পত্রিকার সম্পাদক অধ্যাপক হুমায়ূন কবিরের কাছে জীবনানন্দ তিনটি চিঠি লিখেছিলেন পরপর। যে চিঠির কোনো প্রত্যুত্তর পান নি তিনি। হুমায়ূন কবির শেষপর্যন্ত কিছুই করেন নি, বা করতে পারেন নি। তার কাছে লেখা দ্বিতীয় চিঠি তে ছিল -“বিশিষ্ট বাঙালিদের ভিতর আমি পড়ি না; আমার বিশ্বাস, জীবিত মহত্তর বাঙালিদের প্রশ্রয় পাওয়ার মতনও কেউ নই আমি। কিন্তু আমি সেই মানুষ, যে প্রচুর প্রতিকূলতা সত্ত্বেও প্রতিটি দ্রব্যকে সোনা বানিয়ে তুলতে চায় অথবা মহৎ কোনও কিছু – যা শেষ বিচারে একটা কোনও জিনিসের-মতন-জিনিস; – কিন্তু, ভাগ্য এমনই যে, আজ তার পেটের-ভাত জুটছে না। কিন্তু, আশা করি, একটা দিন আসবে, যখন খাঁটি মূল্যের যথার্থ ও উপযুক্ত বিচার হবে; আমার ভয় হয়, সেই ভালো দিন দেখতে আমি বেঁচে থাকব না। “এই অভাবের কাছেই শেষে হয়তো ভেঙ্গে পড়েন কবি। অভাব-অনটনের জীবন ছেড়ে তিনি চলে যান নীরব অভিমানে।

আচ্ছা কি হয়েছিল সেই অভিশপ্ত ট্রামটির ? শোনা যায়, একদিন দুর্ঘটনা ক্রমে আগুন লাগে তার গায়ে। কবির ঘাতক নিজেও পুড়ে শেষ হয় মর্মান্তিক ভাবেই।একি নিয়তি নাকি এও এক অসম্ভব আত্মহত্যা ? কবিরা তো অসম্ভবেরই রাজা। এই পংক্তি টাও আমাদের অজান্তেই হয়তো সাজিয়ে গিয়েছিলেন জীবনানন্দ, লুকিয়ে রেখেছিলেন, যেভাবে ট্রাঙ্কে লুকানো ছিল তার ধূসর অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি ।
তথ্যসূত্র
১) জীবনানন্দ স্মৃতি – সুবোধ রায়
২) আমরা আত্মহত্যা করছি, কেন করছি – নঈম নিজাম, বাংলাদেশ প্রতিদিন ৪ঠা নভেম্বর, ২০১৫
৩) জীবনানন্দের পাশাপাশি নিজেও আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে গেছিল ঘাতক সেই ট্রাম – অনিতেশ চক্রবর্তী, বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত ।