সুহাসিনী গঙ্গোপাধ্যায় ও তাঁর ‘দেশ বিভাগের ডায়েরি’, Stay Curioussis

মাস্টারদা সূর্য সেন চট্টগ্রামের জালালাবাদ যুদ্ধের কম্যান্ডার লোকনাথ বলকে চন্দননগরে পাঠিয়েছিলেন সুহাসিনীর কাছে৷ সেখানে ছিলেন মাখন ঘোষালও৷ কিন্তু অনন্ত সিংহরা ব্রিটিশদের কাছে আত্মসমর্পণ করায় সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে যায়৷ ফিরিঙ্গি বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণে গুলি খেয়ে পুকুরে পড়ে প্রাণ হারান মাখন ঘোষাল৷ দিনটি ছিল ১৯৩০-এর ২ সেপ্টেম্বর৷ পর দিন পুরো চন্দননগরে অরন্ধন পালিত হয়৷ পলাশীর যুদ্ধে আমরা পরাজিত হলেও বাংলার মানুষ স্বাধীনতার আন্দোলন থেকে পিছু হটেনি। নিরন্তর স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করে গিয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের সেইসব চমকপ্রদ গল্পগুলো ধারাবাহিকভাবে আমাদের ‘স্টে কিউরিয়াস সিস’ পেজে প্রকাশ করার চেষ্টা করে যাচ্ছি । নকল স্বামী-স্ত্রী সেজে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন বিপ্লবী নারী সুহাসিনী গঙ্গোপাধ্যায় ও শশধর আচার্য। কে এই সুহাসিনী গঙ্গোপাধ্যায়? কেন সুহাসিনীকে স্ত্রীর অভিনয় করতে হয়েছিল? আজকে আমরা তারই একটি গল্প বলবো। সুহাসিনী গঙ্গোপাধ্যায় বাংলাদেশের খুলনার মেয়ে l তিনি ১৯০৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা অবিনাশ চন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায় এবং মা সরলা সুন্দরী দেবী। তিনি ঢাকা ইডেন স্কুল থেকে মেট্রিক ও আই এ পাশ করেন। এরপর কলকাতার মুক-বধির বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকুরী শুরু করেন। প্রাণচঞ্চল এই তরুণী অল্প কিছুদিনের মধ্যে গোপন বিপ্লবী দলের নেত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং পরিচিত হয়ে ওঠেন। সেসময় কলকাতায় বিপ্লবী কল্যাণী দাস ও কমলা দাশগুপ্ত মহিলাদের সাঁতার কাটা শেখানোর সংগঠন ‘ছাত্রী সঙ্গ’ পরিচালনা করতেন । সুহাসিনী তাদের সাথে যুক্ত হন এবং ধীরে ধীরে তাদের বিপ্লবী দলের সাথেও যুক্ত হন। পরবর্তীকলে ,১৯২৯ সালে যুগান্তর দলের রসিক দাসের সাথে তার পরিচয় হলে,তাদের দলে সক্রিয় ভ‚মিকা পালন করেন। এভাবে তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি গোপনে অন্যান্য মেয়েদের সাথে নিয়ে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের কাজে নেতৃত্ব দেন। সময় এগিয়ে যায়,১৯৩০ সালে তিনি স্কুলের সুপারিনটেনডেন্ট হন এবং আমেরিকায় উচ্চ শিক্ষার স্কলারশিপ পান। তিনি সেপ্টেম্বর মাসে আমেরিকা যাবেন ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু তার আর আমেরিকায় যাওয়া হয়নি। ১৯৩০ সালের এপ্রিলে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার হামলার পর ফেরারী বিপ্লবীদের অনেকে কলকাতায় চলে আসে। কলকাতায় তাঁদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য যুগান্তর দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সুহাসিনী গঙ্গোপাধ্যায় ও শশধর আচার্য নকল স্বামী স্ত্রী সেজে চন্দননগরে বাড়ি ভাড়া নেন এবং তিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য আমেরিকার লোভনীয় সুযোগকে তুচ্ছ জ্ঞান করেন। এমনকি তিনি কলকাতা স্কুলের চাকুরী ছেড়ে চন্দননগর চলে যান। চন্দননগরের ভাড়া নেয়া বাড়িতে চট্টগ্রাম বিপ্লবের বিপ্লবী অনন্ত সিং, লোকনাথ বল, আনন্দ গুপ্ত, জীবন ঘোষাল আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেসময় ২৩ আগষ্ট কলকাতার ডালহৌসী স্কোয়ারে পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্ডের উপর হামলা হয় এবং ইডেন গার্ডেন পুলিশ ফাঁড়িতে বোমা নিক্ষিপ্ত হয়। ২৯ আগষ্ট ঢাকায় পুলিশের ইনস্পেক্টর জেনারেল লোম্যানকে গুলি করে হত্যা করা হয় ও ঢাকার পুলিশ প্রধান হাডসনকে আহত করা হয়। এর ফলে ইংরেজ সরকার বিপ্লবীদের উৎখাতের জন্য চিরুনি অভিযান শুরু করে এবং যাকে পায় তাকেই বিপ্লবী সন্দেহে ধরে জেলে আটক রাখেন। এদের মধ্যে আটক কালীপদ ঘোষ পুলিশের বিভিন্ন প্রলোভনে রাজসাক্ষী হন এবং চন্দননগরের বাড়ির কথা ফাঁস করে দেয়। পুলিশ এই তথ্য পেয়ে চন্দননগরের ঐ বাড়ি রাতের আঁধারে ঘিরে ফেলে। পুলিশের উপস্থিতিতে পালানোর সুযোগ না পেয়ে চার বিপ্লবী বিশাল পুলিশ বাহিনীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এতে জীব ঘোষাল বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। অবশেষে পুলিশের হাতে সুহাসিনী সহ সকলেই ধরা পড়ে। পুলিশ তাদের উপর বীৎভস ও অমানুষিক নির্যাতন চালায় এবং পরে তাদের জেলে প্রেরণ করে l মামলা শুরু হয় l সুহাসিনী গঙ্গোপাধ্যায় এই মামলায় নির্দোষ হিসেবে মুক্তি পেলেও অন্য মামলায় তাঁর ৭ বছর জেল হয়। তিনি ১৯৩২ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত হিজলী জেলে বন্দি ছিলেন। এসময় তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনে যুক্ত হন এবং জেল থেকে মুক্তি পেয়ে কমিউনিস্ট আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। আবার আসলো নতুন যুদ্ধ l তিনি ১৯৪২ সালে ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনে শরিক হন। তাঁর কাছে দলের চেয়ে ব্রিটিশ শাসন বিরোধী সংগ্রাম ও স্বাধীনতা আন্দোলন প্রধান বলে বিবেচিত হয়। আবারো এক ফেরারী কর্মী হেমন্ত তরফদারকে তাঁর বাড়িতে আশ্রয় দেয়ার অপরাধে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং ১৯৪২ থেকে ৪৫ সাল পর্যন্ত জেলখানায় বন্দিজীবন কাটান। তিনি সারা জীবন তাঁর বিদ্যালয় ও আন্দোলন সংগ্রামে নিয়োজিত ছিলেন। বিপ্লবীদের কাছে তিনি ছিলেন পরম শ্রদ্ধেয় ‘দিদি’ হিসেবে পরিচিত। আজকে আমরা স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক। স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস, মাস্টার দ্যা সূর্যসেন, প্রীতিলতার পাশাপাশি সুহাসিনীদেরও অনেক অবদান রয়েছে। তাদের ভুলে গেলে চলবে না। তাই আমরা পরম শ্রদ্ধায় তাদের স্মরণ করছি। তথ্য Wikipedia