শার্ল বোদলেয়ার একজন ফরাসি কবি, সমালোচক এবং অনুবাদক। ৯ই এপ্রিল ১৮২১ সনে ফ্রান্সের প্যারিসে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে তিনি জন্মগ্রহন করেন।

যখন তাঁর বয়স মাত্র ছয় বছর তখন তিনি পিতৃহারা হন। তাঁর মা আবার যাকে বিয়ে করেন, তিনি ছিলেন মেধাবী,সাহসী ও নীতিবান একজন সৈনিক। পরবর্তীতে তিনি রাষ্ট্রদূত ও সিনেটরও হয়েছিলেন। তাঁর মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে বোদলেয়ার সহজে মেনে নিতে পারেননি, এরফলে পরবর্তীকালে তিনি তাঁর মানসিক ভারসাম্য কিছুটা হারিয়ে ফেলেন। তাঁর সৎবাবা তাঁকে ভালোবাসতেন কিন্তু বোদলেয়ার তাঁকে পছন্দ করতেন না।

তিনি প্রথমে লাতিন কবিতা দিয়ে কবিতা লেখা শুরু করেন।মা-বাবাকে খুশি রাখার জন্য স্কুলে যেতেন কিন্তু তাঁদেরকে গোপন করে লেখালেখি চালিয়ে যেতেন। তাঁর সৎ বাবা তাঁর বন্ধুর সঙ্গে তাঁকে কয়েক মাসের জন্য ভারতে পাঠিয়ে দেন। যাবার পথে ঝড়ে জাহাজের ক্ষতি হলে সেটা মেরামত করার জন্য মরিসাসে নোঙর করা হয়।যেহেতু জাহাজের লোকদের তাঁর পছন্দ হয়নি তাই তিনি ফ্রান্সে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

এ সময় মরিসাসে সাহিত্যমোদি কিছু তরুণের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। এবং যে বাড়িতে তিনি থাকতেন, সেখানে তিনি এক তরুনীর প্রেমে পড়েন, পরে তাকেই তিনি বিয়ে করেন। সেখানে তাঁর বিয়ে পরবর্তী দিনগুলি বেশ আনন্দেই কাটছিলো। এই বিদেশ – বিভূঁয়ে থাকা কালীন সময়ে হঠাৎ করেই তিনি তাঁর দেশের প্রতি তীব্র টান অনুভব করেন। স্বদেশের প্রতি এই টান থেকেই তাঁর ভেতরে জন্ম নেয় এক কবি। এরপর তিনি ভারত ভ্রমন বাতিল করে দেশে ফিরে যান। La Vie anterieure, L’ Invitation au Voyage, A une Dame creole-সহ এ ধরনের কিছু কবিতায় তিনি এই ভ্রমণের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন।

শার্ল বোদলেয়ার, Stay Curioussis

দেশে ফিরে এসে তিনি তাঁর বাবার রেখে যাওয়া বিপুল সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে পান কিন্তু এইসময় তিনি ভোগ-বিলাসে মেতে ওঠেন। তাঁর এ সময়ের সাহিত্য রচনায় ঘৃণা, অমরত্ব এবং স্যাটানিক চিন্তাভাবনা প্রবল হয়ে উঠতে দেখা যায়। তিনি Les Fleurs du Mal-এর জন্য পুরোদমে কবিতা লিখতে শুরু করেন। প্রেমের প্রতি ঘৃণা ও অবক্ষয়ের কবিতাসহ ঈশ্বর নিন্দা ও স্যাটানিক প্রকৃতির বেশ কিছু কবিতা লেখেন। আর এ সময়েই তিনি উন্মাসিক ও প্রথাবিরোধী কবি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

এটাই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে সুখের সময়। বেহিসাবি খরচের জন্য বছর দুয়েকের মধ্যেই তাঁর সম্পদ ক্রমাগত কমতে কমতে অর্ধেকে এসে ঠেকে। আইন অনুযায়ী সম্পত্তি দেখাশোনার জন্য একজন কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয় এবং আরো নিয়ম করা হয় যে তিনি শুধু সম্পদের লাভের অংশটুকুই খরচ করতে পারবেন, মূলধন নয়। এ সিদ্ধান্তে তিনি মনক্ষুন্ন হন এবং জাঁকজমক বেশভূষা চিরদিনের জন্য বর্জন করেন। এরপর তিনি হতাশার কবিতা লিখতে শুরু করেন। তিনি লেখাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন এবং লেখালেখি করেই জীবিকার্জনের চেষ্টা শুরু করেন। তাঁর প্রথম নন্দনতত্ত্ববিষয়ক লেখা Salons of 1845 and 1846 এ সময়েরই লেখা।

১৮৪৮ সালের বিপ্লবের সময় বিখ্যাত চিত্রকর কোরবের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় যাঁর প্রভাব তাঁর কবিতায় বাস্তবতার উন্মেষ ঘটায়।তিনি মনে করতেন সেই লেখকই টিকে থাকবেন, যাঁর লেখা তাঁর সময়টাকে সঠিকভাবে ধরে রাখতে পারবেন।

তিনিই প্রথম কবি, যিনি আধুনিক শহরের সৌন্দর্য এবং ক্ষয়ে যাওয়া একই ক্যানভাসে তুলে ধরেন। ফরাসি বিপ্লবের অপ্রত্যাশিত ফলাফলে অন্য লেখকদের মতো তিনিও বিষন্নতা ও নিরুৎসাহে গা ভাসিয়ে দেন কিন্তু সুইডিস দার্শনিক সুইডেনবর্গ ও এডগার এলেন পো’র রচনাবলি তাঁকে নতুনভাবে উজ্জীবিত করে। ১৮৫২-১৮৫৭ অর্থাৎ Les Fleurs du Mal-এর প্রকাশকাল পর্যন্ত তাঁর লেখা ছিল সবচেয়ে পরিশীলিত এবং পোক্ত। অনেকের ধারণা, বোদলেয়ার লেখক হিসেবে খ্যাতি না পেলেও এলেন পো-র অনুবাদক হিসেবে ফরাসি সাহিত্যে স্থায়ী আসন পেতে সক্ষম হতেন।

তিনি বিশ্বাস করেন যে বস্তুর অস্তিত্ব আছে। কোন বস্তুর সৌন্দর্যে কখনও সার্থকতা নেই, যদি কবি সেই সৌন্দর্যকে তাঁর সৃষ্টিতে ধরে রাখতে ব্যর্থ হন। তিনি মনে করেন যে পৃথিবীর সব কিছুই বস্তুত বর্ণমালার চিত্রলিপি আর শিল্পীর কাজ হচ্ছে সেইসব রহস্য উদ্ধার করা এবং একমাত্র কবিরাই সেই রহস্য উদ্ধারে সক্ষম। ১৮৫৭ সালে Les Fleurs du Mal-এর প্রথম সংস্করণ ছাপা হয়। তিনি তাঁর বইয়ের সাফল্য আশা করেছিলেন মনেপ্রাণে। Les Fleurs du Mal প্রকাশের পর তাঁর বিরুদ্ধে অশ্লীলতা এবং ঈশ্বর নিন্দার অভিযোগ আনা হয়। পরে আদালত ঈশ্বর নিন্দার অভিযোগ তুলে নিলেও অশ্লীলতার জন্য অভিযোগ বহাল রাখে এবং কিছু কবিতা বাদ দিয়ে বাজারজাত করার অনুমতি দেন।

পরে তিনি পরবর্তী সংস্করণ প্রকাশনায় রাজি হন এই ভেবে যে, বাদ দেয়া কবিতার জায়গায় তিনি নতুন কবিতা ঢুকিয়ে দিবেন। তাঁর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রথম সংস্করণের চেয়ে উন্নতমানের হবে বলে তিনি জোর আস্থা প্রকাশ করেন। সমালোচকরাও সেটা স্বীকার করেন। পরবর্তীতে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর লেখা সব কবিতাই তৃতীয় সংস্করণে স্থান পায়। Les Fleurs du Mal-এর ব্যর্থতায় বোদলেয়ার এতটাই মুষড়ে হয়ে পড়েন যে তাঁর নিজস্ব কাব্য দর্শনের প্রতিও আস্থা হারিয়ে ফেলেন। এ সময় তাঁর শরীরে ভাঙন দেখা দিতে শুরু করে। তিনি নিরাশাবাদী কবিতার দিকে ঝুঁকে পড়েন। Les Fleurs du Mal-এর দ্বিতীয় সংস্করণও অর্থনৈতিকভাবে ব্যর্থ হওয়ায় প্রকাশক ১৮৬২ সালে দেউলিয়া হয়ে পড়েন এবং পাওনাদারদের ভয়ে বেলজিয়ামে পালিয়ে যান। প্রকাশকের ঋণ কিছুটা শোধ করার জন্য বোদলেয়ার নিজেও পাড়ি দেন বেলজিয়ামে, ১৮৬৪ সালে বক্তৃতা সফরে। দ্বিতীয় সম্রাটের সময় ফ্রান্সের অনেক লেখক তখন ব্রাসেলসে নির্বাসিত ছিলেন, ফলে ব্রাসেলসের সাহিত্যাঙ্গন তখন বেশ জমজমাট ছিল। তাঁর বক্তৃতা বেলজিয়ামে তেমনভাবে সাড়া জাগাতে পারেনি এবং সেখানে তাঁর লেখারও তেমন কেউ কদর করেননি। কিন্তু জিদের বশে তিনি প্যারিসে না ফিরে সেখান থেকেই ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের প্রকাশকদের সঙ্গে আলোচনা করেন তাঁর লেখার নতুন সংস্করণ প্রকাশের জন্য। প্রকাশকদের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের আগেই তিনি পক্ষাঘাতে অক্রান্ত হন। সামান্য সেরে উঠতেই তিনি প্যারিসে ফিরে যান, কিন্তু তিনি তাঁর কথা বলার ক্ষমতা চিরতরে হারিয়ে ফেলেন।

আগস্ট ৩১, ১৮৬৭ সালে তিনি মারা যান। তাঁর সৎবাবার পাশে তাঁকে কবর দেওয়া হয়। তাঁর মৃত্যুতে তাঁর অনেক ঘনিষ্ঠজনও অনুপস্থিত ছিলেন। এমনকি Les Fleurs du Mal বইটি যে বন্ধুকে উৎসর্গ করেছিলেন, তিনিও ছিলেননা। তাঁর মাত্র দুজন বন্ধু কবরের পাশে সামান্য কিছু বলেন। তাও তাঁর ব্যক্তিজীবন নিয়েই, লেখা নিয়ে নয়। বোদলেয়ারের সব লেখা নিলামে বিক্রি করা হয় ৭০ পাউন্ডে। তাঁর মৃত্যুর ৭০ বছর পর্যন্ত তাঁর রচনাবলি পাঠক সমালোচকদের মধ্যে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে আলোচনায় আসে।

ফ্রাঙ্কো-প্রুসিয়ান যুদ্ধে ফ্রান্সের পরাজয়ের পর আকস্মিকভাবেই পটপরিবর্তন হতে থাকে এবং লেখকরা নতুন ভাবনার দিকে ঝুঁকে পড়েন। এ সময় অনেকেই বোদলেয়ারের রচনা ও দর্শনে অনুপ্রাণিত হন। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তিনি মানুষের মনে এতটাই প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন যে, যা কিছু অধঃপতিত, নীতিবিরোধী, কলুষিত এবং বিকৃত তার সঙ্গেই বোদলেয়ারের নাম যুক্ত হতে থাকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তাঁর প্রতি মানুষের বিরূপ ধারণাগুলোও বদলাতে থাকে।

বোদলেয়ার বৈচিত্র্যময় কবিসত্তার অধিকারী ছিলেন, একদিকে তিনি যেমন কলুষিত ও কুৎসিতের প্রতীক ছিলেন আবার অন্যদিকে একজন মহৎ আধ্যাত্মিক কবিও ছিলেন। তাঁকে বলা হয় সূক্ষ্ম ও বিরল অনুভূতির কবি। প্রেমের কবি হিসেবে তিনি ফরাসিদের মধ্যে অন্যতম এবং সেরা আধ্যাত্মিক কবিদের একজন। এখন অনেকেই মনে করেন তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলি তাঁর মহৎ সৃষ্টি।