কৃষ্ণসাগরের নীল জলরাশি। তার তীরে একসময় দাঁড়িয়ে ছিল এক সমৃদ্ধ গ্রিক নগরী—আপোলোনিয়া পন্টিকা। আজ সেই নগরী নেই; তার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে বুলগেরিয়ার আধুনিক শহর সোযোপোল। কিন্তু মাটির নিচে এখনও ঘুমিয়ে আছে সেই প্রাচীন শহরের গল্প—বাণিজ্য, ধর্ম, যুদ্ধ, সম্পদ, সমুদ্রযাত্রা আর মানুষের জীবনযাপনের অসংখ্য চিহ্ন।
গত দুই দশকের প্রত্নতাত্ত্বিক খনন সেই গল্পের অনেকটাই নতুন করে সামনে এনেছে। বিশেষ করে সোযোপোলের উপকূলের ছোট্ট সেন্ট কিরিক দ্বীপে আবিষ্কৃত মন্দির, বেদি, প্রাচীন মৃৎপাত্র ও স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ আপোলোনিয়া পন্টিকার ইতিহাস সম্পর্কে প্রচলিত অনেক ধারণাকেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
বিপজ্জনক সমুদ্রপথ পেরিয়ে যে শহরে পৌঁছানো যেত
খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে গ্রিক ইতিহাসবিদ জেনোফন কৃষ্ণসাগরের পশ্চিম উপকূলের একটি বিপজ্জনক অঞ্চলের কথা লিখেছিলেন। বর্তমান তুরস্কের কাছাকাছি সালমিডেসোসের আশপাশের সমুদ্র ছিল নাবিকদের জন্য ভয়ংকর। অগভীর চর ও পাথুরে প্রবালপ্রাচীরে ধাক্কা খেয়ে প্রায়ই জাহাজ ডুবে যেত কিংবা আটকে পড়ত।
কিন্তু জাহাজডুবি সেখানে শুধু সমুদ্রের বিপদেই শেষ হতো না। উপকূলে বসবাসকারী থ্রাসীয় জনগোষ্ঠীগুলো জানত—দুর্ঘটনায় পড়া জাহাজ মানেই মূল্যবান পণ্য পাওয়ার সুযোগ। ফলে জাহাজ লুটের প্রবণতা এতটাই বিস্তৃত ছিল যে, কোন উপকূলের কোন অংশ কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তা চিহ্নিত করতে নাকি সীমানা পাথর পর্যন্ত বসানো হয়েছিল।
এই বিপজ্জনক পথ পেরিয়ে যে নাবিকেরা কৃষ্ণসাগরের পশ্চিম উপকূল ধরে উত্তরের দিকে এগিয়ে যেতেন, তাঁদের কাছে আপোলোনিয়া পন্টিকার দেখা পাওয়া নিশ্চয়ই ছিল স্বস্তির মুহূর্ত। কারণ বার্গাস উপসাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত এই নগরী ছিল নিরাপদ আশ্রয়ের মতো।
আজকের বুলগেরিয়ার সোযোপোল শহরই সেই প্রাচীন আপোলোনিয়া পন্টিকা। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা বলছে, শহরটি কৃষ্ণসাগরের বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করেছিল। মাইলেটাস থেকে আসা গ্রিক উপনিবেশকারীরা এখানে বসতি গড়ে তুলেছিল এবং আশপাশের অঞ্চল থেকে ধাতু সংগ্রহ করে সমুদ্রপথে বাণিজ্য চালাত।

আধুনিক সোযোপোল ও এর আশপাশের এলাকার একটি মানচিত্র, যেখানে সেন্ট কিরিক, পুরোনো শহর এবং বিস্তৃত প্রাচীন সমাধিক্ষেত্রের অবস্থান দেখানো হয়েছে। ©the-past.com
মাইলেটাস থেকে আসা গ্রিকদের নতুন শহর
প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, খ্রিস্টপূর্ব ৬১০ সালের দিকে মাইলেটাসের গ্রিকরা এখানে আপোলোনিয়া পন্টিকা প্রতিষ্ঠা করে। তবে সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার বলছে, গল্পটি সম্ভবত আরও পুরোনো।
শহরটি এমন এক জায়গায় গড়ে উঠেছিল যেখানে প্রাকৃতিকভাবেই একটি ভালো বন্দর তৈরি হয়েছিল। সমুদ্রের দিকে এগিয়ে থাকা পাথুরে উপদ্বীপ এবং তার কাছাকাছি ছোট্ট দ্বীপটি জাহাজের জন্য প্রাকৃতিক আশ্রয় তৈরি করেছিল।
অবশ্য গ্রিকদের আগেও মানুষ এই অঞ্চলের গুরুত্ব বুঝেছিল। প্রত্নতাত্ত্বিকরা এখানে খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম সহস্রাব্দের শেষভাগের—অর্থাৎ প্রায় ৫,০০০ বছরেরও বেশি পুরোনো—মানব বসতির চিহ্ন খুঁজে পেয়েছেন।
আর গ্রিকরা যখন এখানে নিজেদের শহর গড়ে তুলল, তখন তারা শুধু সমুদ্রবন্দর পায়নি; পেয়েছিল আরও একটি বড় সুবিধা। শহরের পেছনের থ্রাসীয় ভূখণ্ডে ছিল ধাতব সম্পদের উৎস। ফলে সমুদ্রবাণিজ্য আর স্থলভাগের সম্পদ—দুইয়ের সুবিধাই একসঙ্গে কাজে লাগাতে পেরেছিল আপোলোনিয়া।
এই সম্পদের শক্তি কতটা ছিল, তার একটি অসাধারণ প্রমাণ ছিল দেবতা অ্যাপোলোর বিশাল মূর্তি। অ্যাপোলো আইয়াত্রোস—অর্থাৎ ‘আরোগ্যদাতা অ্যাপোলো’—এর মূর্তিটি প্রায় ১৩ মিটার উঁচু ছিল। নগরীর প্রধান ধর্মীয় কেন্দ্রের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই মূর্তি দূর থেকেই নগরীর ঐশ্বর্য ও ধর্মীয় গুরুত্বের ঘোষণা দিত।

সেন্ট কিরিক দ্বীপে পাশাপাশি অবস্থিত খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের শেষভাগ থেকে পঞ্চম শতকের শুরুর দিকের দুটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। © wikimedia
যে দ্বীপের নিচে লুকিয়ে ছিল শহরের হৃদয়
প্রাচীন আপোলোনিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রহস্যগুলোর একটি লুকিয়ে ছিল সমুদ্রের ছোট্ট দ্বীপ সেন্ট কিরিকে।
আজ দ্বীপটি সোযোপোল বন্দরের অংশ। কিন্তু বহু শতাব্দী আগে এখানেই ছিল আপোলোনিয়ার ধর্মীয় কেন্দ্র—সম্ভবত শহরের প্রাথমিক বসতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাম্প্রতিক খননে এখানে তিনটি প্রাচীন মন্দির, একটি বিশাল বেদি, ধর্মীয় উৎসর্গের গর্ত এবং বিপুল পরিমাণ গ্রিক মৃৎপাত্রের সন্ধান মিলেছে।
তবে এই সত্য আবিষ্কার করতে প্রত্নতাত্ত্বিকদের দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়েছে।
১৯০৪ সালে ফরাসি কনসাল আলেকজান্দ্র দ্যগ্রাঁ প্রথমবার দ্বীপটিতে খনন শুরু করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল প্রাচীন লেখকদের বর্ণিত অ্যাপোলোর বিখ্যাত মন্দিরটি খুঁজে বের করা। গ্রিক ভূগোলবিদ স্ট্র্যাবো লিখেছিলেন, অ্যাপোলোর মন্দিরটি একটি দ্বীপে অবস্থিত ছিল। তাই সেন্ট কিরিককে সম্ভাব্য স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।
কিন্তু প্রথম খননে দ্যগ্রাঁ হতাশ হন। তিনি কোনো বিশাল মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ পেলেন না। বরং সামনে এলো বেশ কিছু কবর এবং প্রাচীন বস্তু। ফলে তাঁর ধারণা হয়েছিল, দ্বীপটি সম্ভবত একটি সমাধিক্ষেত্র; অ্যাপোলোর মন্দির নিশ্চয়ই অন্য কোথাও।
এরপর ইতিহাস যেন দ্বীপটির ওপর অন্য পরিকল্পনা করল।

একটি বিশাল বেদির ভিত্তি © wikimedia
প্রত্নস্থল থেকে নৌঘাঁটি
১৯২০-এর দশকে দ্বীপটিতে একটি সামুদ্রিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে সেটিই নৌ-অ্যাকাডেমিতে পরিণত হয় এবং শেষ পর্যন্ত পুরো দ্বীপটি সামরিক নৌঘাঁটিতে রূপ নেয়।
ফলে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার দরজা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
১৯৭০-এর দশকে সেখানে আরও ভবন নির্মাণ করা হলেও সবকিছুই করা হয়েছিল কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের জন্য দ্বীপটি হয়ে ওঠে একেবারেই অপ্রবেশযোগ্য।
অবশেষে ২০০৫ সালে সামরিক বাহিনী দ্বীপটি ছেড়ে যায়। কয়েক বছর পর সেখানে পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনার কথা ছড়িয়ে পড়ে। আর সেই পরিকল্পনাই অপ্রত্যাশিতভাবে প্রাচীন আপোলোনিয়ার ইতিহাস উন্মোচনের নতুন দরজা খুলে দেয়।
২০০৯ সালে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব আর্কিওলজি অ্যান্ড মিউজিয়ামের প্রত্নতাত্ত্বিক ক্রাস্তিনা পানায়োতোভার নেতৃত্বে আবার শুরু হয় খননকাজ।
এবার যা বেরিয়ে এলো, তা আগের সব ধারণাকে ছাপিয়ে গেল।
মাটির নিচে তিন মন্দির
খননের প্রথম মৌসুমেই প্রত্নতাত্ত্বিকরা বুঝতে পারেন—তাঁরা সাধারণ কোনো পুরোনো বসতির সামনে দাঁড়িয়ে নেই।
একটি বিশাল প্রাচীন খ্রিস্টীয় ব্যাসিলিকার ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেল। সেটি খ্রিস্টীয় পঞ্চম বা ষষ্ঠ শতকের। আর তার ঠিক পাশেই বেরিয়ে এলো আরও পুরোনো গ্রিক মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ।
পরবর্তী খননে আরও একটি মন্দিরের অস্তিত্ব নিশ্চিত হয়। সব মিলিয়ে সেখানে অন্তত তিনটি মন্দির পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল। এগুলোর নির্মাণকাল খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের শেষভাগ থেকে পঞ্চম শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত।
মন্দিরগুলো খুব বড় ছিল না—প্রতিটির দৈর্ঘ্য আনুমানিক ১১ থেকে ১২ মিটার। সম্ভবত সামনের দিকে দুটি স্তম্ভ ছিল। সময়ের আঘাতে ভবনের অধিকাংশই হারিয়ে গেছে; এখন শুধু পাথরের ভিত্তিগুলো টিকে আছে।
ধারণা করা হয়, পরবর্তী খ্রিস্টীয় যুগে এসব প্রাচীন স্থাপনার মার্বেল ও অন্যান্য পাথর খুলে নিয়ে চুনের ভাটায় ব্যবহার করা হয়েছিল। সেই চুন দিয়েই হয়তো পরে নির্মিত হয়েছিল বিশাল খ্রিস্টীয় ব্যাসিলিকা।
তবু সবকিছু হারিয়ে যায়নি।
কোথাও একটি স্থাপত্যখণ্ড, কোথাও মূর্তির হাত, আবার কোথাও অসাধারণ কারুকার্যময় মৃৎফলক—প্রতিটি টুকরো যেন হারিয়ে যাওয়া শহরের গল্পের একটি করে পৃষ্ঠা।

সেন্ট কিরিক দ্বীপে খননকাজের সময় পাওয়া অ্যাপোলোর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা মানতস্বরূপ নিবেদনসামগ্রী। ©the-past.com
মৃত যোদ্ধা আর ঘোড়সওয়ারের গল্প
খননের সবচেয়ে আকর্ষণীয় আবিষ্কারগুলোর একটি হলো একটি সূক্ষ্ম কারুকাজ করা সিরামিক ফ্রিজ। এতে দেখা যায় গ্রিক পদাতিক যোদ্ধাদের সঙ্গে এক অ-গ্রিক অশ্বারোহীর সংঘর্ষ।
প্রত্নতাত্ত্বিকরা এখন পর্যন্ত এর প্রায় ২৩টি খণ্ড উদ্ধার করেছেন। এগুলো দেখে বোঝা যায়, একই ছাঁচে তৈরি একাধিক ফলক কোনো একটি স্থাপনার অলংকার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।
দৃশ্যটি যেন যুদ্ধের মাঝখান থেকে তুলে আনা একটি মুহূর্ত।
গ্রিক হপলাইটরা এগিয়ে যাচ্ছে। একজন যোদ্ধার হাতে রয়েছে শিঙা। তাদের সামনে বা পাশে পড়ে আছে একজন নিহত যোদ্ধা। আর তার ওপরে ছুটে যাচ্ছে এক অশ্বারোহী, হাতে বর্শা।
অশ্বারোহীর ঢালটি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। সেটি দেখতে পেল্টা ধরনের—যে ধরনের ঢাল প্রাচীনকালে থ্রাসীয়দের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত ছিল।
তাই গবেষকদের মনে প্রশ্ন জেগেছে—এ কি গ্রিক ও থ্রাসীয়দের মধ্যকার কোনো সংঘর্ষের প্রতিচ্ছবি?
নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে শিল্পরীতি দেখে ফ্রিজটিকে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের শেষভাগের বলে মনে করা হচ্ছে। এর শিল্পভাবনার সঙ্গে ডেলফির বিখ্যাত সিফনিয়ান ট্রেজারির যুদ্ধদৃশ্যের মিল রয়েছে, যা খ্রিস্টপূর্ব ৫২৫ সালের কাছাকাছি নির্মিত হয়েছিল।
অর্থাৎ, আপোলোনিয়ার শিল্পীরাও তখন গ্রিক বিশ্বের বৃহত্তর শিল্পধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছিলেন।

সেন্ট কিরিক দ্বীপে পাওয়া এই প্রত্নযুগীয় (Archaic-period) পেয়ালাটিতে একটি উৎসর্গলিপি রয়েছে। লিপিটি হাতলের নিচে, পেয়ালার গোলাপি আভাযুক্ত অংশের নিচের দিকে দেখা যায়। এতে উল্লেখ রয়েছে যে পেয়ালাটি অ্যাপোলো আইয়াত্রোসের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়েছিল। ছবি: তদোর দিমিত্রভ।
সত্যিই কি এটাই ছিল অ্যাপোলোর প্রধান মন্দির?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আসে আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রমাণ।
খননস্থলে অসংখ্য ছোট ছোট গ্রাফিতি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বারবার দেখা যায় I এবং H—যেগুলো সম্ভবত Ietros, অর্থাৎ ‘আরোগ্যদাতা’ শব্দটির সূচনাংশ।
তারপর ২০১৩ সালে পাওয়া গেল আরও চমকপ্রদ একটি বস্তু—খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের প্রথমার্ধের প্রায় সম্পূর্ণ একটি কাপ।
কাপটির গায়ে একটি উৎসর্গলিপি ছিল। সেখানে অ্যাপোলো আইয়াত্রোসকে উৎসর্গ করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, উৎসর্গকারী ব্যক্তি আপোলোনিয়ার বাসিন্দা ছিলেন না। তিনি এসেছিলেন ক্নিদোস নামের একটি শহর থেকে—যা বর্তমান তুরস্কের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে, আপোলোনিয়া থেকে প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার দূরে।
কাপটি দেখতে হয়তো খুব সাধারণ। কিন্তু আপোলোনিয়ায় এই ধরনের কাপ অত্যন্ত বিরল। ফলে প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, এটি স্থানীয় বাজার থেকে কিনে দেবতাকে উৎসর্গ করা কোনো সাধারণ পাত্র ছিল না। বরং দূরদেশ থেকে আসা সেই ভক্ত সম্ভবত নিজের শহর থেকেই কাপটি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন।
এতে বোঝা যায়, অ্যাপোলোনিয়ার ধর্মীয় গুরুত্ব শুধু স্থানীয় মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ এখানে এসে দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করত।
শহরটি যতটা পুরোনো ভাবা হতো, তার চেয়েও পুরোনো
সবচেয়ে বড় চমক অবশ্য এসেছে মৃৎপাত্র থেকে।
মাইলেটাসের গ্রিকরা কৃষ্ণসাগরের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক উপনিবেশ স্থাপন করেছিল। বর্তমান ইউক্রেনের উপকূলের বেরেজান দ্বীপ এবং রোমানিয়ার হিস্ত্রিয়া ছিল তাদের গুরুত্বপূর্ণ বসতিগুলোর মধ্যে দুটি।
প্রাচীন সূত্র অনুযায়ী, এই শহরগুলোর প্রতিষ্ঠা আপোলোনিয়ার চেয়ে কয়েক দশক আগে। কিন্তু সেখানে পাওয়া মৃৎপাত্রের সঙ্গে সেন্ট কিরিক দ্বীপে পাওয়া প্রাচীন মৃৎপাত্রের মিল এতটাই বেশি যে গবেষকদের ধারণা বদলাতে শুরু করেছে।
নতুন আবিষ্কারগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, আপোলোনিয়া পন্টিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভবত প্রচলিত খ্রিস্টপূর্ব ৬১০ সালের চেয়েও আগে। সাম্প্রতিক গবেষণায় এর সূচনা খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকের শেষভাগের কাছাকাছি ধরে দেখার যথেষ্ট কারণ পাওয়া যাচ্ছে।
এর অর্থ হলো, আপোলোনিয়া হয়তো কৃষ্ণসাগরের গ্রিক উপনিবেশ স্থাপনের প্রথম দিকের অধ্যায়গুলোরই একটি অংশ।
আর সেটি অস্বাভাবিকও নয়।
কারণ কৃষ্ণসাগরের পশ্চিম উপকূল ধরে উত্তর দিকে যাওয়া জাহাজগুলোর জন্য এই স্থানটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ বন্দর, সমুদ্রপথের সুবিধা এবং কাছাকাছি ধাতব সম্পদ—সবকিছু মিলিয়ে এখানে একটি শক্তিশালী নগরী গড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো যেন আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল।

আপোলোনিয়া পন্টিকার প্রাচীন মৃৎপাত্রের উদাহরণগুলোর মধ্যে রয়েছে খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকের শেষভাগের এই ‘পাখির পাত্র’টি (উপরে) এবং খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের শুরুর দিকের একটি পেয়ালায় ষাঁড়কে আক্রমণরত সিংহের চিত্র (নিচে)।
এক শতাব্দীর মধ্যেই বদলে গেল শহরের চেহারা
সেন্ট কিরিক দ্বীপের মাটির নিচে পাওয়া স্তরগুলো শহরের দ্রুত বিকাশের একটি অসাধারণ ছবি তুলে ধরে।
প্রত্নতাত্ত্বিকরা খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের প্রথমার্ধের একটি বাড়ির ধ্বংসাবশেষ পেয়েছেন। কিন্তু পরে সেই বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়। তার জায়গায় নির্মাণ করা হয় একটি বিশাল ধর্মীয় বেদি।
এরও নিচে পাওয়া গেছে খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকের স্তর।
অর্থাৎ, শহর প্রতিষ্ঠার মাত্র একশ বছরের মতো সময়ের মধ্যেই আপোলোনিয়ার মানুষ এতটাই সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল যে তারা পুরোনো বসতি সরিয়ে একটি বিশাল ধর্মীয় এলাকা তৈরি করতে শুরু করেছিল।
এটি শুধু একটি মন্দির নির্মাণের গল্প নয়। এটি একটি ছোট উপকূলীয় বসতি থেকে একটি সমৃদ্ধ নগররাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার গল্প।
প্রথমে এসেছিল বসতি। তারপর বন্দর ও বাণিজ্য। বাণিজ্যের সঙ্গে এল সম্পদ। আর সেই সম্পদ দিয়ে মানুষ নির্মাণ করল মন্দির, বেদি ও দেবতার বিশাল মূর্তি।
মাটির নিচে এখনও বেঁচে আছে আপোলোনিয়া
আজ আপোলোনিয়া পন্টিকা নেই। তার জায়গায় আধুনিক সোযোপোল—পর্যটক, সমুদ্রসৈকত আর আধুনিক জীবনে ব্যস্ত একটি শহর।
কিন্তু সেন্ট কিরিক দ্বীপের নিচে এখনও রয়ে গেছে সেই প্রাচীন নগরীর হৃদস্পন্দন।
একসময় যে দ্বীপকে প্রত্নতাত্ত্বিকরা ভুল করে কেবল একটি প্রাচীন সমাধিক্ষেত্র বলে মনে করেছিলেন, সেখানেই এখন পাওয়া যাচ্ছে আপোলোনিয়ার ধর্মীয় কেন্দ্রের চিহ্ন। মন্দিরের ভিত্তি, বেদি, দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা পাত্র, যুদ্ধের দৃশ্য খোদাই করা অলংকার, প্রাচীন বসতির স্তর—সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে একটি হারিয়ে যাওয়া শহরের ছবি।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিটি নতুন আবিষ্কার শুধু অতীতের একটি নতুন বস্তু সামনে আনছে না; বরং পুরোনো ইতিহাসকেও নতুন করে লিখতে বাধ্য করছে।
হয়তো আপোলোনিয়া পন্টিকার গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই—একটি শহর হারিয়ে যেতে পারে, তার মন্দির ধ্বংস হতে পারে, তার মূর্তি ভেঙে যেতে পারে; কিন্তু মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা ছোট ছোট নিদর্শন একদিন আবার সেই শহরকে কথা বলাতে পারে।
আর সেন্ট কিরিকের মাটি থেকে উঠে আসা প্রতিটি নতুন টুকরো যেন আজও সেই প্রাচীন সমুদ্রনগরীর কণ্ঠে বলে যাচ্ছে—আপোলোনিয়া এখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।


