দক্ষিণ ভারতে রোমানদের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ শুধু পণ্য আদান-প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল শিল্প, স্থাপত্য ও সংস্কৃতিতেও। বিশেষ করে খ্রিস্টীয় প্রথম কয়েক শতকে ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যপথে দক্ষিণ ভারতের বন্দরগুলো রোমান বিশ্বের সঙ্গে একটি সক্রিয় যোগাযোগের সেতু হয়ে উঠেছিল। মুজরিস (Muziris), নেলসিন্ডা (Nelcynda) এবং অন্যান্য বন্দর দিয়ে মসলা, মুক্তা, হাতির দাঁত, বস্ত্র ও নানা মূল্যবান পণ্যের পাশাপাশি রোমান সাম্রাজ্য থেকে আসত মদ, কাচের পাত্র, ধাতু, অলংকার এবং অন্যান্য বিলাসপণ্য। প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার ও প্রাচীন সাহিত্যিক সূত্রে দক্ষিণ ভারতে এই দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্যিক যোগাযোগের নানা প্রমাণ পাওয়া যায়।
দীর্ঘদিনের এই যোগাযোগের ফলে শুধু পণ্য নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের পরিচয়, নকশা, রুচি ও শিল্পভাবনারও আদান-প্রদান ঘটেছিল বলে মনে করা হয়। অমরাবতীর শিল্পে বিদেশি, বিশেষত হেলেনিস্টিক ও রোমান শিল্পরীতির কিছু বৈশিষ্ট্যের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা হয়েছে। তবে এসব সাদৃশ্যকে সরাসরি ‘রোমান শিল্পীদের হাতে তৈরি’ বলে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। বরং বাণিজ্য, যাতায়াত এবং বহুসাংস্কৃতিক যোগাযোগের মাধ্যমে শিল্পরীতির কিছু বৈশিষ্ট্য ভারতীয় শিল্পীরা নিজেদের নান্দনিক ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়েছিলেন—এমন ব্যাখ্যাই বেশি গ্রহণযোগ্য।

প্রাচীন ভারত ও রোমের বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ
পরবর্তী দক্ষিণ ভারতীয় শিল্প-ঐতিহ্যেও বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের নানা প্রতিফলন দেখা যায়। মহাবালিপুরামের ভাস্কর্য ও স্থাপত্য সেই দীর্ঘ আন্তঃআঞ্চলিক সাংস্কৃতিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তবে এর শিল্পরীতিকে সরাসরি রোমান প্রভাবের ফল হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ মহাবালিপুরামের প্রধান শিল্প ও স্থাপত্য পল্লব যুগের, যা প্রাচীন রোম-ভারত বাণিজ্যের সবচেয়ে সক্রিয় সময়ের তুলনায় অনেক পরের। ফলে এখানে সরাসরি রোমান প্রভাবের দাবি করার বদলে বৃহত্তর ভারতীয় মহাসাগরীয় সাংস্কৃতিক যোগাযোগের দীর্ঘমেয়াদি প্রেক্ষাপটটি বিবেচনা করাই বেশি যুক্তিযুক্ত।
রোমান বিশ্বের সঙ্গে শিল্পগত যোগাযোগের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি অবশ্যই গান্ধার শিল্পরীতি। কুষাণ সম্রাট কনিষ্কের সময়, বিশেষ করে খ্রিস্টীয় প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দীতে, গান্ধার শিল্পের অসাধারণ বিকাশ ঘটে। বুদ্ধের মূর্তিতে ঢেউ খেলানো চুল, বাস্তবধর্মী মুখাবয়ব এবং বিশেষ করে পোশাকের ভাঁজে যে গভীরতা ও স্বাভাবিকতা দেখা যায়, তার সঙ্গে গ্রিক-রোমান ভাস্কর্যের উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্য রয়েছে।
এই সাদৃশ্য সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে বুদ্ধমূর্তির পোশাকের উপস্থাপনায়। ভারী কাপড়ের ভাঁজ, শরীরের ওপর কাপড়ের স্বাভাবিক পতন এবং ভাঁজের মাধ্যমে শরীরের গঠন ফুটিয়ে তোলার কৌশলে গ্রিক-রোমান ভাস্কর্যের পরিচিত বৈশিষ্ট্যের প্রতিধ্বনি খুঁজে পাওয়া যায়। তবে গান্ধার শিল্পকে নিছক ‘রোমান শিল্পের অনুকরণ’ হিসেবে দেখাও ঠিক নয়। এটি ছিল গ্রিক, রোমান, ইরানীয়, মধ্য এশীয় ও ভারতীয় নানা শিল্প-ঐতিহ্যের সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা একটি স্বতন্ত্র শিল্পভাষা।

অগাস্টাসের মন্দির © wikipedia
দেওয়ালচিত্র ও অলংকরণের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও এই আন্তঃসাংস্কৃতিক বিনিময়ের চিহ্ন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে ‘ভাইন স্ক্রোল’ বা লতানো আঙ্গুরলতার নকশা গ্রিক-রোমান শিল্পে বহুল ব্যবহৃত একটি মোটিফ, যা ভারতীয় শিল্পেও বিভিন্ন রূপে দেখা যায়। একইভাবে ফুল, লতা, পাখি, দ্রাক্ষালতা ও অন্যান্য অলংকরণমূলক নকশা এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ভ্রমণ করেছে এবং স্থানীয় শিল্পীরা সেগুলো নিজেদের রুচি ও ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন।
অর্থাৎ রোমান বণিকেরা শুধু সোনা, মদ, কাচের পাত্র কিংবা বিলাসপণ্য নিয়ে আসেননি; তাঁদের সঙ্গে এসেছিল নকশা, রুচি, শিল্পভাবনা এবং ভূমধ্যসাগরীয় বিশ্বের একটি বিস্তৃত সাংস্কৃতিক অভিঘাত। একইভাবে ভারত থেকেও রোমান বিশ্বে পৌঁছেছিল মসলা, মূল্যবান পাথর, বস্ত্র, হাতির দাঁত এবং অন্যান্য পণ্যের পাশাপাশি ভারতীয় সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের নানা পরিচয়। বাণিজ্য তাই এখানে ছিল একমুখী প্রবাহ নয়; বরং ছিল দুই ভিন্ন সাংস্কৃতিক জগতের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগের একটি মাধ্যম।
এই যোগাযোগের একটি আকর্ষণীয় সাক্ষ্য পাওয়া যায় Tabula Peutingeriana-তে। এটি প্রাচীন রোমান সড়ক ও যোগাযোগপথের তথ্য বহনকারী একটি মানচিত্রের মধ্যযুগীয় অনুলিপি, যার অন্তর্নিহিত তথ্যের কিছু অংশ প্রাচীন রোমান যুগে ফিরে যায়। এতে দক্ষিণ ভারতের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর মুজরিসের উল্লেখ রয়েছে। মুজরিস ছিল রোম-ভারত সমুদ্রবাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এবং প্রাচীন গ্রিক-রোমান সূত্রেও এর গুরুত্বের কথা পাওয়া যায়।

মুজরিসের প্রত্নবস্তু
আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো, মুজরিসের কাছে মানচিত্রটিতে ‘Templum Augusti’ বা অগাস্টাসের মন্দির হিসেবে ব্যাখ্যা করা একটি স্থাপনার চিহ্ন রয়েছে। বহু গবেষক এটিকে মুজরিসে রোমান বণিক বা অন্যান্য ভূমধ্যসাগরীয় মানুষের উপস্থিতির সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছেন। তবে এই মন্দিরের বাস্তব অস্তিত্বের স্বতন্ত্র প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ এখনও নিশ্চিতভাবে পাওয়া যায়নি; ফলে বিষয়টিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে না দেখে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সূত্র ও সম্ভাব্যতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা অধিক সতর্ক।

অমরাবতী মন্দিরের ভাস্কর্যে রোমান ভাস্কর্যের প্রভাব © Vatican Museum
তারপরও মুজরিসের গুরুত্ব নিয়ে সন্দেহের খুব বেশি অবকাশ নেই। প্রাচীন সাহিত্য, রোমান মুদ্রার আবিষ্কার এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন—সব মিলিয়ে বোঝা যায় যে দক্ষিণ ভারতের সঙ্গে রোমান বিশ্বের বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল বিস্তৃত ও দীর্ঘস্থায়ী।
তাই প্রাচীন ভারত ও রোমের সম্পর্ককে শুধু ‘বাণিজ্য’ বললে পুরো গল্পটি বলা হয় না। জাহাজে করে যে সোনা, মসলা ও বিলাসপণ্য এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেত, তার সঙ্গে অদৃশ্যভাবে যাতায়াত করত শিল্পের নকশা, স্থাপত্যের ভাবনা, পোশাকের ভাঁজ, অলংকরণের মোটিফ এবং মানুষের নান্দনিক রুচি।
বাণিজ্যের পথ ধরেই এক সভ্যতার শিল্পভাষা অন্য সভ্যতার শিল্পে নতুন রূপে জন্ম নিত। কখনও তা সরাসরি প্রভাব হিসেবে দেখা দিয়েছে, কখনও স্থানীয় শিল্পীরা বিদেশি মোটিফকে নিজেদের মতো করে গ্রহণ করেছেন, আবার কখনও সেই সাদৃশ্যের পেছনে ছিল একই ধরনের বৃহত্তর সাংস্কৃতিক যোগাযোগ। এই কারণেই প্রাচীন ভারত ও রোমের সম্পর্ককে শুধু পণ্য ও মুদ্রার ইতিহাস হিসেবে দেখলে তার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অধ্যায়টি হয়তো অদেখাই থেকে যায়। এটি ছিল মানুষের চলাচল, ধারণার বিনিময় এবং শিল্পের ভাষায় একে অপরকে আবিষ্কার করার—প্রাচীন বিশ্বের এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক সংলাপ।

মুজরিসের অবস্থান শনাক্ত করতে কেরালায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ শুরু হয় ২০০৪ সালে। ছবিতে কেরালার পট্টানাম গ্রামে পরিচালিত সেই প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যের দৃশ্য দেখানো হয়েছে।

