১৯২৬ সালে অম্বা তহশিলের বারাবাই এলাকার একটি গ্রামে গোহর বানুর জন্ম। তারা খুবই গরীব ছিল। মা,ছোট বোন তারা আর ভাই আলাদিন এই নিয়ে ছিল তাদের সংসার। দুইবোন নাচ- গান করতো আর তার ভাই বাজাতো । তাদের মা আসগরি বাই ছিল অসামান্য সুন্দরি এবং নাচে গানে পারদর্শী। মেয়েরা তার রুপ এবং গুন দুটোই পেয়েছিল। তারা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নেচে গেয়ে যা রোজগার করতো সেটা দিয়েই তাদের সংসার চলতো। গোহরবানু পুতুলের মতো সুন্দর ছিল তাই লোকে তাকে আদর করে পুতলিবাঈ বলে ডাকতো। তার মা বেশী টাকা রোজগারের আশায় তাদের সবাইকে নিয়ে আগ্রা যায়, সেখানে তারা নাচ গান করে খুব খ্যাতি অর্জন করে। পুতলিবাঈয়ের সুখ্যাতি লখনৌ থেকে কানপুর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। একবার ঢোলপুরের জমিদারের ছেলের বিয়েতে যখন তাকে গান গাইবার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় তখন একরাতে চম্বলের ডাকাতরা সেই বাড়ি আক্রমণ করে এবং সুলতান সিং নামের এক ডাকাত তাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। তখন তার বয়স ছিল মাত্র পঁচিশ বছর। খবরটা বিদূ্ৎ বেগে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। চম্বলের বেহোড় যাবার পর পুতলিবাঈ যখন জানতে পারে সুলতান সিং চুরাশিটি খুনের আসামী এবং পুলিস তাকে খুঁজছে, তখন সে ভয়ে খুব কষ্ট করে সেখান থেকে পালিয়ে তার নিজ গ্রামে ফিরে যায়। গ্রামের লোকজন সুলতান সিংয়ের ছোঁয়া পুতলিবাঈকে ঘৃনার সাথে প্রতাখ্য্যন করে এবং একঘরে করে দেয়। সে বুঝতেও পারেনি এখানে তার কি অপরাধ ছিল। সুলতান সিংয়ের খবর জানার জন্য পুলিশরা তাকে কখনো থানায়, কখনো বা বাড়িতে নিয়ে গিয়ে দিনের পর দিন জেরা করতো, আর রাতের পর রাত চলতো তার উপর পাশবিক অত্যাচার। এতসব কিছু সহ্য করতে না পেরে সে আবার চম্বলের বেহোড়ে সুলতান সিংয়ের কাছে ফেরত চলে যায় এবং তার সাথে ঘর বাঁধে। সুলতান সিং তাকে বন্দুক চালানো শিখায়, তার বন্দুকের নিশানা ছিল নিখুঁত। ‘তান্নো’ নামে তাদের একটি মেয়ে হয়। ডাকাত জীবনের খারাপ ছায়া যাতে মেয়ের উপর না পড়ে তাই তাকে সে তার মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেয়। দল ভারি করার জন্য সুলতান সিং লাখন সিংয়ের দলে যোগ দেয় কিন্তু লাখন সিংয়ের নজর পড়ে পুতলিবাঈয়ের উপর। লাখন সিং নানা ছুতায় সুলতানের ক্ষতি করার চেষ্টা করতে থাকে। একরাতে যখন তারা ঘুমিয়ে ছিল তখন পুলিশ তাদের ডেরায় হানা দেয় এবং সেই রাতে বন্দুকের গুলিতে সুলতান সিং মারা যায়। কিছু ডাকাত যারা ব্যাপারটা চাক্ষুষ দেখেছিল তাদের কয়েকজন পুতলিবাঈকে জানায়, পুলিশ নয় লাখন সিংয়ের ইশারায় ‘কল্লা’ ডাকাত সুলতান সিংকে খুন করেছে। পুতলিবাঈ বুঝতে পারে তার স্বামীর সাথে লাখন সিংয়ের দল বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। খুব কষ্ট পেয়ে সে যখন গ্রামে তার মেয়েকে দেখতে আসে তখন পুলিশের চর মারফত খবর পেয়ে সাথে সাথে পুলিশেরা তাকে ঘেরাও করে,বাধ্য হয়ে সে আত্মসমর্পন করে। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। পরে যখন তাকে আগ্রা আনা হয় তখন সে জামিনে ছাড়া পেয়ে ফেরার হয়ে যায় এবং চম্বলের বেহোড় ফেরত যায়, সর্বপ্রথম সে কল্লা সিংকে হত্যা করে। এরপর সে হয়ে উঠে ভয়ংকরী এক দস্যু ,সুলতানের দলের কর্তৃত্ব সে নিজের হাতে তুলে নেয়। যারা যারা তার সাথে অন্যায় করেছিল তাদের উপর প্রতিশোধ নিতে থাকে এবং একের পর খুন করতে থাকে।
১৯৫৬-১৯৫৮ পর্যন্ত সে একটানা সন্ত্রাস চালিয়ে যায়। সুলতানের মৃত্যু এবং দলের বিশ্বাসঘাতকদের শাস্তি দেওয়ার পর দলের অনেকেই তাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল কিন্তু পুতলিবাঈ সবাইকে না করে দেয়। দলের অন্যান্য সদস্যরা একটা নারীর নেতৃত্ব সহজভাবে নিতে পারেনি। ১৯৬৫ সালে পুতলি তখনকার প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুকে একটা চিঠি দিয়েছিল যে সুলতান সিং পুলিশের হাতে নয় ডাকাতদের হাতে মারা গেছে কিন্তু পুলিশরা এটা অস্বীকার করে। পুলিশের সাথে এক এনকাউন্টারে তার একটা হাতে গুলি লাগে তাই তার সেই হাতটা কনুই থেকে কেটে বাদ দিতে হয় কিন্তু একহাতেই সে নিঁখুতভাবে বন্দুক ছুঁড়তে পারতো। ২৩শে জানুয়ারি ১৯৫৮ মোরেনার কোহর গ্রাম থেকে একটু দুরে ছিল পুতলীর গ্যাং। লাখন সিংয়ের দলকে অনুসরন করতে গিয়ে পুলিশ পড়ে পুতলিবাঈয়ের গ্যাং এর সামনে, সেদিন এক শ্বাসরুদ্ধ লড়াই হয়েছিল চম্বলের বেহোড়ে। মুহু্র্মুহু গুলির শব্দে কাঁপছিলো চম্বলের বেহোড় অন্চল, কিন্তু হঠাৎ করেই তার দল গুলিগোলা বন্ধ করে দেয়। সে বুঝতে পারে তার দলের বিশ্বাসঘাতকতা, চম্বলের বেহোড় নারীর দখলে থাকবে এটা পুরুষেরা মানতে পারেনি। সে চম্বল নদীতে এক হাতে সাঁতার কেটে পালাতে চেয়েছিল। বাকি ছিল আর মাত্র কয়েক ফুট, সেটুকু যেতে পারলেই সে পালাতে সক্ষম হতো। কিন্তু পর পর কয়েকটা গুলি উড়ে এসে তার গায়ে বিঁধে। পানি থেকে শরীরটা পুরোপুরি ডাঙায় তুলতেও পারেনি সে, অর্ধেকটা শরীর কোনমতে তুলে নেতিয়ে পড়েছিল চম্বলের অসমান এবড়ো থেবড়ো মাটিতে। গুলি কি পুলিশের ছিল নাকি তার দলের বিশ্বাসঘাতকদের সেটা আর তার জানা হলোনা। মাত্র ৩২ বছর বয়সে তার জীবনাবসান হয়। মৃত্যর পর তার চোখদুটি খোলা ছিল, কি দেখতে চেয়েছিল সে? তার মেয়েকে নাকি দলের সেই বিশ্বাসঘাতকদের সেটা আর জানা হলোনা!
#তথ্যসুত্র অভিশপ্ত চম্বল— তরুন কুমারভাদুড়ী ইন্টারনেট